Monologue -08
রাত ১১ঃ৫০, আখাউড়া রেলওয়ে স্টেশন। পুরো স্টেশন জুড়ে কারেন্ট নেই।ওয়ান টাইম চায়ের কাপ হাতে ১নং প্ল্যাটফর্মের একদম শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। পূর্নিমার চাঁদটা চায়ের মধ্যে দুলছে । চাঁদের আলো, দুধ চায়ের রং এর সাথে মিলে অদ্ভুত একটা রং তৈরি করেছে। পূর্ণিমার আলোয় এই আশ্চর্য এক ক্ষমতা, চায়ের রং এর মতো নিজের মন খারাপ, মন ভালো কিংবা ক্লান্তিবোধ এর সাথে মিশে কেমন যেন গুলিয়ে ফেলে সব। না থাকে কোনো মন খারাপবোধ, না থাকে ক্লান্তি না থাকে উৎফুল্লতা,অদ্ভুত রকমের একটা শান্তি, নীরবতা কাজ করে মনে।
আওয়াজ শুনে পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি একটা কুকুর আমার পিছু নিয়েছে। কুকুরটাকে দেখে নিজের অজান্তেই হেঁসে ফেললাম। অন্ধকারের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি, কি মায়া নিয়ে আমার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে আছে। জানি এই মায়া দেখানো তার স্বার্থের জন্য, তারপরও প্রশংসা করতেই হয়। এই মায়া যে কোনো কাউকে মায়ায় ফেলতে বাধ্য, ঠিক প্রিয় মানুষের মায়ায় পড়ার মতো! বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বিস্কুটের একটা প্যাকেট এনেছিলাম সাথে করে, যদি মাঝরাতে ক্ষিদে পাই খাবো বলে। বিস্কুটটা ব্যাগ থেকে বের করে প্যাকেট ছিঁড়ে কুকুরটাকে একটা একটা করে দিচ্ছি। একটা বিস্কুট দিয়ে আমি অপেক্ষা করছি, কখন সে মায়াবী চেহারা নিয়ে আমার দিকে তাকাবে আর আমি আবার আরেকটা ছুঁড়ে মারবো! ঠিক অনেকটা যেন ভালোবাসার মানুষকে করুণা করার মতো, মানুষটা আপনাকে পছন্দ করে, তার আবদার রাখার পরিবর্তে অপেক্ষায় রাখার মতো!
বিস্কুট খাওয়ানো শেষ হলে এবার হঠাৎ করে আমার মনে হলো কুকুরটাকেও একটু চা খাওয়ানো উচিত। এতো সুন্দর ভরা জ্যোৎস্নায় চা এর সাথে পূর্ণিমা বিলাস করার অধিকার তারও আছে। তারও হয়তো ইচ্ছে জাগে এই মাঝ রাতে চায়ে চুমুক দিয়ে সারাদিনের টঁইটঁই করে ঘুরা ক্লান্তিগুলো ভুলে যেতে! আমার প্রিয় মানুষটা একটা ভীষণ রকমের ইচ্ছে পোষণ করে ছিল আমার কাছে, "ভরা জ্যোৎস্নায় স্টেশনে বসে দুজনে একই কাপে চুমুক দিবো বলে" । তার ইচ্ছে তো আর পূরণ করতে পারলাম না, এই অবলা কুকুরটার ইচ্ছে তো পূরণ করতে পারি! এর আগে কখনো কুকুরকে চা খেতে দেখি নি, খাওয়াই নি ও৷ তাই দ্বিধাদ্বন্দ্বে আছি কিভাবে বেচারাকে চা খাওয়ায়। কিছুক্ষণ ভেবে, চায়ের কাপটা এগিয়ে দিলাম, গন্ধ শুঁকতে গিয়ে কাপটা কাঁত করে ফেলে দিলো। আমার ভীষণ রাগ উঠে গেল, এই বুঝি আপ্যায়নের প্রতিদান! তারপর দেখলাম, কুকুরটা ফ্লোর থেকে জিহ্বা দিয়ে খাচ্ছে। তা দেখে রাগ তো দূরের কথা, নিজের বোকামির জন্য নিজেকে গালি দিলাম। আসলেই আমি একটা গাঁধা, কাকে কিভাবে আপ্যায়ন করতে হয় বুঝতে পারি না। প্রিয় মানুষটার জন্যও হয়তো আপ্যায়নে এভাবেই ঘাটতি রেখেছিলাম!
১২ঃ১০ আমার ট্রেন স্টেশনে নিঃশব্দে প্রবেশ করলো। কারেন্ট এর আগেই চলে এসেছিলো। কুকুরটাকে এবার বিদায় দেওয়ার পালা। অদ্ভুত হলেও সত্যি, খেয়াল করলাম যে, কুকুরটাকে বিদায় দিতে চাপা কষ্ট লাগছে আমার ।এই অল্পকিছু সময়ে কুকুরটার মায়ায় পড়ে গিয়েছি আমি, জ্যোৎস্না আর প্রিয় মানুষটার স্মৃতি যেন সে মায়া আরো দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তাই মায়া কাটাতে, আসার সময় কর্কশ একটা ধমক দিয়ে বললাম," হুশ্, যা। অনেক খাওয়াইসি, ভাগ "।
এটা আমার মায়া কাটানোর একটা উপায়! যার মায়ায় পড়ে যাবেন, তাকে ছাড়তে হলে ইতিটা কখন সুখকর করা যাবে না, রাখা যাবে না শেষ মুহুর্তের কোনো স্মৃতিও। যদি তা করেন, তাহলে পরবর্তীতে আপনাকে প্রচুর ভুঁগতে হবে, ভয়ংকর সব স্বপ্ন আপনার রাতের ঘুম কেঁড়ে নিবে। অন্তত আমার অভিজ্ঞতা তাই বলে!
তারপরও ট্রেন ছাড়ার পর দরজা দিয়ে উঁকি দিলাম, কুকুরটাকে শেষ মুহূর্তে আরেকবার দেখার জন্যে!!!
Monologue -08
৯-ই সেপ্টেম্বর ২০২২
রবিবার, রাত ১ঃ০০
![]() |

মন্তব্যসমূহ
বৃষ্টি থামার পর বাইরে গিয়ে দেখি কি সুন্দর রংধনু!!! তাও দুটো রংধনু একসাথে। আমার ফোনের ক্যামেরা ভালো না তাও তুলে পাঠালাম আপনার জন্য।
https://drive.google.com/file/d/1-L7P7VpiM7zQzv0JTlbFrgZrW9FlOzBx/view?usp=drivesdk
বিঃদ্রঃ ছবি টার কোয়ালিটি খুব বাজে, এডিট করেছি যেন রংধনু টা বুঝা যায়। আসলে আমার ফোনের ক্যামেরা খুব বাজে, তাও এতো সুন্দর দৃশ্য দেখে মোবাইলে বন্দী করা আর আপনাকে পাঠানোর লোভ টা সামলাতে পারিনি। তাই কিছু মনে করবেন না প্লিজ।