ইদ-উল-আযহা'২৩
কারো জন্য ইদ আনন্দের, কারো জন্য ইদ দায়িত্বের। সকালে ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে ইউটিউব দেখে সেমাই করতে রান্না ঘরে গেলাম। সেমাই রান্না প্রায় শেষ, নামিয়ে ফেলার সময় মনে পড়ল এতে চিনিই দেওয়া হয়নি। কী বিশ্রী এক অবস্থা! তাড়াতাড়ি করে সেমাই চুলায় বসিয়ে চিনি দিলাম। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি নামাজের টাইম হয়ে যাচ্ছে। তাড়াতাড়ি করে গোসল করে রেডি হয়ে নামাজে গেলাম।
নামাজ থেকে এসে ফোন হাতে নিয়ে দেখি আপুদের কল উঠে আছে। কল ব্যাক করলাম। ছোট্ট আপু ফোন দিয়ে কান্নাকাটি লাগিয়ে দিলো, আমরা কিভাবে কি করছি এসব ভেবে। প্রতি ইদে আপুরা ফোন দিয়ে এসব বলে মন খারাপ করে দেয়। তখন কতো মিথ্যে বলে যে সান্ত্বনা দিতে হয় এদের! আল্লাহ মাফ করুক আমাকে।
কুরবানির কাজ শেষ করে বাসায় এসে পড়তে হয় আরেক বিপাকে। কিভাবে মাংস প্যাকেট করতে হয়, মাংস ধুয়ে প্যাকেট করতে হয় নাকি এমনিই রেখে দিতে হয়, হাড় আলাদা রাখা লাগে নাকি মাংসের সাথে প্যাক করে ফ্রিজে রেখে দিতে হয়? অবশেষে বাধ্য হয়ে দিলাম আপুকে ফোন। এক আপু ফোন না ধরায়, আরেকজনকে কল দিলাম। আপু বুঝিয়ে দিলো সব। মাংস প্যাক করছি আর মনে মনে হাসছি, "এসব তো আমার সিলেবাসে ছিলো না, এখন এসব ও শিখতে হচ্ছে"। এর মাঝে বড় কাকী আসলো উনিও বুঝিয়ে দিয়ে গেলো। কাকী বলে গেল,"সব কিছু একা করতে হয়, শিখে ফেলো আস্তে আস্তে সবকিছু। পরে কাজে লাগবে"। আমি আপন মনে হাসছি আর নিজেকে বলছি,"সিলেবাসের বাইরে যে আরো কতোকিছু শিখতে হবে !"
গোসল করে বের হলাম। ক্লান্তিতে শরীর বিছানায় লেপ্টে যেতে চাচ্ছে, আগের রাতেও ঘুম হয়নি। আব্বার শরীর খারাপ,উনাকে লেবুর শরবত করে দিয়ে নিজের রুমে আসলাম। জানালায় পর্দা টেনে রুমটা অন্ধকার করে শুলাম। চোখ বন্ধ করে ঘুমে তলিয়ে যাচ্ছিলাম এমনিই বাইরে থেকে ডাক। উঠে গিয়ে কাজ সেরে আবার এসে গোসল করতে হলো। রুমে এসে আবার শুয়ে পড়লাম। ঘড়ি দেখলাম ৪:১৫ বাজে। ক্লান্তিতে চোখ ঝাপসা হতে শুরু করলো। গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম।
ঘুম যখন ভাঙ্গে তখন ঘড়িতে ৭:৪৮ বাজে। লাফ মেরে উঠে রান্না ঘরে গেলাম। রান্না করার কথা ছিল বিকেলে, এখন রাত হয়ে গিয়েছে প্রায়! ফ্রীজ থেকে সব বের করলাম, কাটাকাটি করে নিলাম পেঁয়াজ রসুন। পেঁয়াজের ঝাঁঝে চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। এর মাঝে ইউটিউবে রেসিপিটা আরেকবার দেখে নিলাম কিভাবে কি করতে হবে।
রান্না শেষ করতে করতে ৯টা বেঁজে গিয়েছে। এতো আগ্রহ নিয়ে রান্না করলাম, এখন মুখে নিয়ে দেখি লবণ বেশি হয়েছে, মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
আম্মার কথা খুব মনে পড়ছে এখন। একটা সময় তরকারিতে লবণ বেশি হলে কিংবা মন মতো না হলে খেতে চাইতাম না। কী জ্বালাতনটাই না করতাম তখন। এখন ইউটিউব দেখে রান্না করি, সব কাজ একা একা করতে হয়, খাবার মনমতো না হলেও খেতে হয়। রান্নার সময় আব্বার কথা ভেবে তরকারিতে ঝাল কম দিতে হয়, ইমরানের কথা ভেবে আলু দিতে হয়। কী এক অদ্ভুত সিচুয়েশনের মধ্য দিয়ে যে যাচ্ছি নিজেই কনফিউজড ভালো আছি নাকি খারাপ!
অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলে ,রাতে না খেয়ে শুয়ে পড়লে, রান্নার সময় মাঝপথে রেসিপি ভুলে গেলে, রাত করে ঘরে ফিরবার সময় যখন মোবাইলে শুন্য মিস কল, তখন আম্মা আর আপুদের খুব মিস করি। একাকীত্ব ভয়ংকর সুন্দর,যা আমি প্রতিনিয়ত অনুভব করছি। আটদশটা সাধারণ জীবনের মতো জীবন আমি কেন পাই নি, এই নিয়ে স্রষ্টার কাছে আমার এখন আর কোনো অভিযোগ নেই। অভিজ্ঞতা আর একাকীত্ব আমাকে যেই সেল্ফ স্টীম উপহার দিচ্ছে ,তা হয়তো বাকি আটদশটা জীবন উপভোগ করলে পেতাম না।
মানুষ হারাতে হারাতে শুধরায় । আমি প্রতিনিয়ত নিজেকে শুধরে যাচ্ছি !
মন্তব্যসমূহ