সমুদ্র
আমার সমুদ্র পছন্দ, খুব বেশিই পছন্দ। যতোবারই কেউ জিজ্ঞেস করেছে পাহাড় নাকি সমুদ্র, আমি সমুদ্র বলতে দ্বিতীয়বার আর চিন্তা করিনি। ছোটবেলায় আঙ্কেল টমাস কেবিন থেকে শুরু করে তিনগোয়েন্দার গল্পে সমুদ্রের গল্পগুলো আমাকে ভীষণভাবে টানতো। ছোটবেলায় দুপুরে খাওয়ার পর কত অলস দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা পেরিয়েছে গল্পের বইয়ের পাতায় সমুদ্রের অভিযানে! সেই সমুদ্র, সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা, তীরে ঝিনুক কুড়ানো, স্বচক্ষে দেখার সুযোগ হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠে। এরপর কখনো এক মাসে দুইবার, কখনো বছরের ট্যুর সমুদ্রে, টানা যাওয়া হয়েছে।
এই ৮-১০ বারের সমুদ্র দর্শন, আমাকে প্রতিবারেরই যেন এক অদ্ভুত রকমের একাকীত্ব অনুভব করিয়েছে। এ এক ভিন্ন রকমের একাকীত্ববোধ! যতোবারই গিয়েছি, তার আগে প্রতিবারই আমার মানসিক অবস্থা ছিল ভিন্ন, জীবনের অনেক পরিস্থিতিই ছিল ভিন্ন রকম। কিন্তু সমুদ্রের ঢেউ, সমুদ্রের তীর, সবকিছু সেই আগের মতোই দেখি গিয়ে প্রতিবার। তারপর বুঝলাম, মানুষ পাল্টায় সমু্দ্র ঠিক আগের মতোই থাকে।
রাতে খাওয়াদাওয়ার পর যখন একাকী হাঁটতে বের হতাম সমুদ্রের তীরে, তখন সমুদ্রের বিশাল গর্জন কানে তালা লাগিয়ে দিতো যেন। ভাটার সময় হাঁটতে হাঁটতে খেয়াল করতাম মুহুর্তেই হুহু করে জোয়ার এসে শুকনো বালুর তীর ডুবিয়ে দিচ্ছে। যেই শুকনো বালুর তীর দিয়ে আমি হেঁটে এসেছি সেখানে কয়েক মিনিটের ব্যাবধানে হাঁটু পানি! এই যে চঞ্চলতা, সমুদ্রের শুধু নিজের সাথেই। সে যেন তার নিজের তালে, নিজের গতিতে, নিজের মতো করে রুটিনমাফিক জোয়ার-ভাটার খেলা খেলছে!
একবার সমুদ্রে ঝড় দেখার সুযোগ হয়েছিলো, তীব্র সে ঝড়। তখন মনে হলো সমুদ্র ভীষণ নিষ্ঠুর। যেমনটা সৌন্দর্য দিয়ে সবকিছুকে আকর্ষণ করে, ততোটা নিষ্ঠুরতা দিয়ে সবকিছু গ্রোগাসে গিলে নেয় পেটে। অনেকটা সুদিনে পাশে থেকে, দুর্দিনে ছেড়ে যাওয়া প্রেমিকার মতো!
সমুদ্রের তীরে বিকেল বেলা একদল মানুষকে দেখা যায় ঝিনুক, পাথর কুড়াতে। এসব বিক্রি করেই তাদের সবার ঘর-সংসার চলে। তার একদম নিঃশব্দে, নির্বিঘ্নে নিজের কাজ করে। আশেপাশে কি হচ্ছে, কে কি করছে এসবে তাদের কারো কোনো মাথা ব্যাথা নেই যেন। আরেকদল মানুষ সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে আগেই জাল বোঝাই নৌকা নিয়ে তীরে ফিরে। অনেক নৌকায় জেলেদের মুখে হাসি, আবার অনেক নৌকার জেলেদের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ পড়ে থাকে। এদের চেহারা দেখেই আঁচ করা যেত যে, কোন নৌকায় আজকে বেশ ভালো মাছ ধরা পড়েছে। আমি দূর থেকে এদের দেখতাম আর ভাবতাম,
"সমুদ্রের তীরে বসবাসকারী মানুষগুলো আর যা-ই হোক নাস্তিক হতে পারে না, এরা বেশ ভালোভাবেই নিয়তিতে বিশ্বাসী।প্রতিদিন নিয়ত করে সমুদ্রে যায়, ভাগ্য নিয়ে সমুদ্র থেকে ফিরে " !
আমার এখনো সমুদ্র ভীষণরকমের ভালো লাগে। কোনো একদিন সবকিছু ছেড়ে ছুঁড়ে সমুদ্রে চলে যাবো। সেখান থেকে শুরু হবে হয়তো কোনো নতুন গল্প কিংবা স্রোতের সাথে বিলীন হবে সকল যান্ত্রিকতা!

মন্তব্যসমূহ