আমরা কেউ আর দেশপ্রেমিক নেই
আগে মানুষ চোর ডাকাতদের ভয় পেতো। এখন আর এই যুগ নেই। যুগ পাল্টে গেছে। মানুষ এখন শিক্ষিত মানুষদের বেশি ভয় পায়। কেমন যেন বিতৃষ্ণার ভয়! এই ভয়, সম্মান দেখিয়ে ভয় পাওয়া নয়। এই ভয় অন্তরে অসম্মান নিয়ে বাইরে ভীতসন্ত্রস্ত হওয়া!
৬ বছর ধরে ট্রেনে প্রায়শই সপ্তাহে সপ্তাহে যাতায়াত করি। ট্রেনে TTE থাকে, মাঝে মাঝে মোবাইল কোর্টও। এতো বছরে এক দুইজন TTE আর মোবাইল কোর্ট ছাড়া আর কাউকে তার কাজে সৎ থাকতে দেখি নাই! গায়ে সফেদ সাদা পোশাক, মুখে সুন্নতি দাঁড়ি রেখে বিনা টিকেটে ভ্রমণ করা যাত্রীদের থেকে উপঢৌকন নিচ্ছে তাও কোনো ডকুমেন্টস না দিয়ে। এই টাকা কখনো সরকারি খাতে যাবে না, যাবে এদের সিন্ডিকেটের ভাগবাটোয়ারাতে। কোনো যাত্রী যদি একটু টাকা কম দেয় কিংবা সহজ সরল হয়, এদের ব্যবহার এতোটা বাজে হয় যে দেখে বুঝায় যাবে না এরা ডিগ্রীধারী শিক্ষিত ভদ্রমানুষ! এর উপর ট্রেনে তো যাত্রীর থেকে হকার আর ভিক্ষুক বেশি। এক হকারের সাথে কথা বললাম, এদেরও নাকি উপঢৌকন দিতে হয় সিন্ডিকেটকে। আমরা যারা স্ট্যান্ডিং টিকেট কাটি এবং মেয়ে মানুষদের যে কি ভোগান্তি হয় এই হকার আর ভিক্ষুকদের জন্য, তা কেবল আমরাই সামনে থেকে দেখি। অথচ পুরো রেলওয়ে খাতটা এই উচ্চ শিক্ষিত সাদা পোশাকধারী দরবেশদের কাছে জিম্মি। যাত্রীরা জানে ঘুষ দিচ্ছে, তারপরও ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে সালাম দেয় এদের!
রমজানে এক প্রাইভেট ব্যাংকে গেলাম একাউন্ট খুলতে। আমার ব্যাংকের একাউন্টের বিষয়ে তেমন জ্ঞান না থাকায়, ডেস্কে বসা মানুষটাকে যথেষ্ট সম্মান দিয়ে কথা বলছিলাম। ৩ ঘন্টা লাগিয়ে একাউন্ট খুলে দিলো। পরে জানতে পারি এরা এদের সুবিধা মতো, যে একাউন্টের চার্জ বেশি কাটে তা খুলে দিয়েছে, এটিএম কার্ডের চার্জও বেশি। পরবর্তী একাউন্ট ট্রান্সফার করতে গেলাম, ডেস্কে গিয়ে দেখি আগের অফিসারই বসে আছে। আশেপাশে অনেক মানুষ। অনেকেই একাউন্ট খুলতে এসেছে, অনেকে একাউন্ট ব্যালেন্স চ্যাক দিতে। যারা এসেছে তাদের অধিকাংশের কথাবার্তায় বুঝা যাচ্ছিলো তেমন শিক্ষিত না তারা, কিন্তু ডেস্কে বসে থাকা লোকটাকে সম্মান দিতে কমতি রাখছিলো না কেউই। কিন্তু ডেস্কে বসা মানুষটা চরম বিরক্তি সুরে কর্কশ গলায় কথা বলছিলো এদের সাথে। বসে বসে এসব দেখছিলাম আর আমার নিজের মেজাজ খারাপ হচ্ছিলো। অবশেষে সামনে তাকিয়ে আমার দিকে ফিরলো। রমজানে যেই কোমল কন্ঠে কথা বলেছিলাম তার বিন্দুমাত্র আমার মাঝে নেই তখন। অনেকটা কঠিন গলায় যখন কথা বললাম, তখন স্বীকার করেছে যে উনি আমি যেমন একাউন্ট খুলতে বলেছিলাম তা খুলে দেয়নি। এর আগে ভুজুংভাজুং বুঝাচ্ছিলো। এদের দেখলে আমার ডিগ্রিধারী সার্ভেন্ট ছাড়া আর কোনো সম্মানই কাজ করে না আর।
গত দুই সপ্তাহ ধরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কি ঘটছে, তা তো সবারই জানার কথা, ন্যাশনাল নিউজ এখন। অথচ একটা সময় আব্বার সাথে বসে যখন পত্রিকা পড়তাম কিংবা বড় কাকার সাথে পড়াশোনা নিয়ে আলোচনা করতাম, তখন তারা আমাকে বলতো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণকে নাকি বুদ্ধিজীবী বলা হয়। উনাদের ক্লাস করলে নাকি অনেককিছু শিখা যায়, উনারদের লাইফস্টাইল অনুকরণীয়, উনারা নাকি দেশের ফাস্ট ক্লাস নাগরিক। আমি তখন থেকে পত্রিকায় সম্পাদকীয় পৃষ্ঠা পড়তাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্ঞান-গর্বের কলাম বুঝার জন্য। এসব পড়তাম আর ভাবতাম, ইশশ কবে কলেজ শেষ হয়ে ভার্সিটিতে যাবো উনাদের ক্লাস করতে,পাবলিকে চান্স পেলেই তো উনাদের প্রতিদিন দেখতে পাবো! ফাস্ট ইয়ারের এক সেমিস্টার যাওয়ার পরই ধারণা পাল্টে যায়, আর এখন তো টিভিতে বসে বসে যখন মারামারি দেখে বাসার লোকজন তখন কৈফিয়ত দেওয়ার মতো কোনো উত্তর খুঁজে পাই না আর আমি!
এই হলো আমাদের প্রিয় বাংলাদেশের প্রধান তিন খাত রেলওয়ে, অর্থনীতি আর শিক্ষা খাতের ছোট্ট তিনটা বাস্তব উদাহরণ। দেশের বাকি খাতগুলোতে আমার মতো সাধারণ নাগরিকরা আরো কি কি নির্মম বাস্তবতার স্বাক্ষী হয় প্রতিদিন, তা বর্ণনা করতে গেলে উপন্যাস হয়ে যাবে। এদেশের সিস্টেমের কাছে জিম্মি মানুষ। আর এই সিস্টেম চালায় এমন সাদা পোশাকধারী কিছু দরবেশ!
আগে মানুষ রূপকথার গল্প লিখতে রাজারানী আর পক্ষীরাজ ঘোড়ায় চড়া রাজপুত্র ক্যারাক্টার আনতো। আর আমরা এখন রূপকথার গল্প মনে করি, যখন বাবা-চাচা রা তাদের আমলের দেশ প্রেমের গল্প শোনায়! এখন আমরা কেউ আর দেশপ্রেমিক নেই, এটা একটা রূপকথার চরিত্র হয়ে গেছে আমাদের জন্য। এখন দেশের বাইরে চলে যাওয়ার কথা বললে কিংবা পড়াশোনার জন্য বাইরে যাওয়ার কথা বললে কেউ আর উল্টো জিজ্ঞেস করে না, "বাজান দেশ ক্যান ছাড়বা?"। উল্টো পারলে বলে, " বাজান, তোমার বাচ্চা কাচ্চারে মানুষ করতে চাইলে দেশে আর ফিরা আইসো না, ওখানেই স্যাটেলড হওয়ার চেষ্টা কইরো পড়াশোনা শেষ করে "।
এই সিস্টেম আর সিস্টেমের দরবেশদের জন্য কতো ছেলে যে দেশকে ঘৃণা করা শুরু করেছে, তার হিসেব পাওয়া যায় ক্যাম্পাসের বন্ধুদের সাথে ক্যারিয়ারের গল্প করতে বসলে। ১০ জনের ৮ জন-ই দেশ ছাড়তে পারলে যেন শুকুর আলহামদুলিল্লাহ, যেন হাফ ছেড়ে বাঁচে !!!
মন্তব্যসমূহ