আবেগের ঘোর লাগা কেটে গেলে আমরা ম্যাটারিয়ালিস্টিক হয়ে পড়ি
ক্লাস থ্রি-তে যখন বৃত্তি পেলাম, খুব ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষায় করছিলাম কখন বৃত্তির টাকা হাতে পাবো। সেই টাকা দিয়ে ক্যারাম বোর্ড কিনার তীব্র আশা নিয়ে বসে ছিলাম। সেই টাকা পেতে পেতে প্রায় ৬'মাস, ততোদিনে ক্যারাম বোর্ড কিনার সেই আগ্রহ একদম মরে যায়। এরপর জীবনে আর কখনো ক্যারাম বোর্ড কিনা হয়নি!
এরপর যখন ক্লাস সেভেনে উঠলাম, সাইকেল কিনে দেয়ার বায়না ধরি। অনেক অভিনয় আর আকুতি-মিনতির পর যখন বুঝতে পারলাম কোনোভাবেই সাইকেল কিনে দেবে না, তখন নিজে টাকা জমানো শুরু করলাম। ৩ মাস লাগিয়ে তখন ৩৭৫/- টাকা জমাতে পেরেছিলাম পড়ার টেবিলের ড্রয়ারটায়। রোজ বেশ কয়েকবার করে খুলে দেখতাম টাকা ঠিকঠাক আছে কিনা! আর হিসেব করতাম পাঁচ হাজার হতে আর কতো টাকা বাকি। তারপর একদিন, এই ঝোঁকও মাথা থেকে নেমে গেল, যখন দেখলাম এতো টাকা জমাতে জমাতে আমি বুড়ো হয়ে যাবো! সেই টাকা দিয়ে ইচ্ছে মতো গল্পের বই আর ম্যাগাজিন কিনেছিলাম তখন। সাইকেলের কথা মনে পড়লেই, তিন গোয়েন্দা সিরিজে ডুব দিতাম। কিশোর,মুসা,রবিন এর মতো বন্ধু পাবার স্বপ্ন দেখতাম তখব। এরপর সাইকেল কিনার মতো টাকা অনেকবার হাতে এসেছিলো, সাইকেলটা আর কিনা হয়নি! এভাবে নিজের ইচ্ছেগুলোকে ডাইভার্ট করা শিখে গেলাম তখন থেকেই।
এরপর থেকে হঠাৎ একদিন খেয়াল করলাম খেলার মাঠ আমাকে আর পিছু টানে না, মনে শখ-আহ্লাদ তেমন কাজ করে না। শখের কথা বলার জন্য বলি, শেখার জিনিস শেখার হলে শিখি, বাঁচার মতো খাবার হলেই খেতে পারি। কেমন যেন জীবন থেকে উৎসাহ উদ্দীপনা হারিয়ে যাচ্ছে। জীবন থেকে পালিয়ে মুভিতে থ্রিলার খুঁজি। এই অনুভূতি তীব্র অমানুষিক যন্ত্রণায় দেয় এখন। এক কথায়, ম্যাটারিয়ালিস্টিক এর ফর্মাল ডেফিনেশন যেন বেশ ভালোভাবে গেঁথে গিয়েছে মনে। এখন যতো শখ জন্মায়, কোনো কিছুতে আকৃষ্ট হয়, সবকিছু সাময়িক মনে হয়। মনে হয়, সময় সবকিছুকে বদলে দিবে যেকোনো সময়।
এই সময়ের স্রোতের টানে এসে আমরা কতো প্রিয় মানুষ হারালাম, কতো বন্ধু শত্রু হয়ে গেল, কতো স্বপ্ন ভেঙ্গে চুরমার হয়ে গেল, কতো বিলাসিতা নেক্রপলিসে দাফন করলাম, তার সঠিক কোনো হিসেব নেই। সময় এর সাথে যারা সাঁতার কেটে পাড়ি দিতে পারে, বদলে যেতে পারে, বদলে যাওয়া মেনে নিতে পারে, তারা সুখী, তীব্র সুখী মানুষ!
আসলে, সময় সবকিছু বুঝিয়ে দেয়। বুঝিয়ে দেয় কোন জিনিসটা আসলেই আমাদের দরকার আর কোন জিনিসটা আমাদের না হলেও চলে। সময় নিজের যোগ্যতা আর অবস্থান একটা সময় চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। সেদিন থেকে জীবন অদ্ভুতভাবে বদলে যায়। আবেগের ঘোর লাগা কেটে গেলে আমরা ম্যাটারিয়ালিস্টিক হয়ে পড়ি।
মন্তব্যসমূহ