কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৪- কনসার্ট প্রসঙ্গে
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবথেকে ভালো দিকগুলোর একটা হলো, ৫২ একরের এই ছোট ক্যাম্পাস খুবই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং সাজানো-গোছানো। আর আমার দেখা সবথেকে ভালো দিক কি জানেন? বিগত চার বছরের ক্যাম্পাস লাইফে আজ পর্যন্ত কাউকে দেখলাম না ক্যাম্পাসের ভেতরে প্রকাশ্যে ধুমপান কিংবা অশালীন চলাফেরা করতে। বাইরে থেকে যতবার ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডস এসেছে, এই একটা কারণে প্রশংসা করতে শুনেছি-ই তাদের।
এবার আসি গত কালকের কনসার্টের ব্যাপারে। আমরা যারা কনসার্টে যাই, আমাদের অধিকাংশই বন্ধুরা মিলে একসাথে উদযাপন করতে কিংবা কিছুটা সময় ভালো মূহুর্ত সঞ্চার করতে যাই। কনসার্টে যাওয়া মানে গাঁজার আসর বসানো নয়, বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে লিরিক্স উপভোগ করা নয়। ম্যাচিউরড ছেলে-মেয়ে কখনো এসব করে না, এসবের সমর্থনও করে না। সব ব্যান্ডদলের ফ্যানবেজ ক্রেজি গাঁজাখোরও না!
কালকের এতো বড় এই কনসার্টের আয়োজনের জন্য Platform(কুবি মিউজিক ব্যান্ড) অবশ্যই প্রশংসা প্রাপ্য। এবং আমরা এর জন্য প্রশংসা করেও যাচ্ছি একদম ইভেন্টের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত । কিন্তু থাকে না, কিছু ভুলক্রুটি। সব বড় বড় ইভেন্টেই কিছুটা মিস-ম্যানেজমেন্ট হয়ে থাকেই। উনাদেরও হয়েছে। একে তো হাজার হাজার(কোথাও বলা হচ্ছে ১৫ হাজার) মানুষের এই আগমন, তার উপর উনাদের এতো বড় ইভেন্ট প্রথম অর্গানাইজড করা, কিছু ভুল থাকতেই পারে। তবে আমার মতে কিছু ভুল একান্তই কাম্য ছিল না।
বহিরাগত আসবে মানে উল্টাপাল্টা এক্টিভিটিস, নোশাখোরদের সমাগমন হবে এটা পূর্বেই আন্দাজে ছিলো। এর জন্য আপনারা ভার্সিটির প্রধান ফটকে যেই সিকিউরিটি চেক পয়েন্ট দিয়েছিলেন তা মোটেও ঠিকঠাক মতো হয়নি। আমার মতে এভাবে একজনকে কয়েকবার বডি চেক করা একটা হ্যারাসমেন্ট ছাড়া আর কিছুই না। আমি ভার্সিটির ছাত্র বলার পরও গায়ে হাত দেওয়া হচ্ছিলো এমনভাবে যে, আমার হাতের স্মার্টওয়াচ(Magnetic strap) খুলে ছিটকে পড়ে গিয়েছিল ফ্লোরে (অবশয় এরজন্য Sorry বলেছে ভাইয়া)। কথা হলো এভাবে চেক করে প্রথম প্রথম এন্ট্রি নেওয়া হলেও, পরে এমন চেক কোথায় ছিলো? দশ হাজার মানুষকে এভাবে হাঁতিয়ে দেখতে পারার চিন্তা করাটাও কতোটা যুক্তিযুক্ত ছিলো? আপনারা মেশিনের ব্যবস্থা করতে পারতেন অথবা মাঠে পুলিশি বুথের ব্যবস্থা করতে পারতেন কর্ণারগুলোতে। মানে, যদি ফর্মালিটির স্বার্থে এই চেক করা হয়ে থাকে তাহলে আর কিছু বলাবার নেই এই বিষয়ে!!! স্টেজ থেকে বার বার চিৎকার করে বলতে হচ্ছিলো স্টেজ থেকে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াতে নয়তো স্টেজ ভেঙে যেতে পারে,প্রোগ্রাম বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু ভলেন্টিয়ার দিয়ে Human Chain বানিয়ে নিলে বারবার এই ভোগান্তিতে পড়তে হতো না৷
Drugs আর People management এর ব্যর্থতার বিষয়টা বাদ দিলে বলতে হবে, আপনারা অনেক সুন্দর একটা প্রোগ্রাম আয়োজন করতে পেরেছেন। কুবির ইতিহাসে এর থেকে বড় প্রোগ্রাম আগে কেউ করতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই! আমাদের জন্য একটা স্মৃতি হয়ে থাকবে আপনাদের এই আপ্রাণ চেষ্টার এই প্রোগ্রাম। Platform, you deserve a big shout-out for this event. আমরা কুবিয়ানরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ❤️
এবার আসি কনসার্টের আসা Cool-dudeদের কথায়। এরা এসেছিলোই এক্স-গার্লফ্রেন্ডদের ছবি প্রিন্ট করে প্রকাশ্যে পোড়াবে বলে। কতোটা বিকৃতি চিন্তাভাবনা থাকলে মানুষ এমন attention seek করতে কনসার্টে আসে! একটা মেয়ে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে মানে নিশ্চয়ই তার সিলেকশানে ভুল ছিলো কিংবা তার নিজের মাঝে ঘাটতি ছিলো। এটা মেনে না নিয়ে বরং পাবলিক প্লেসে এসে সবাইকে মেয়ের পার্সোনাল ছবি দেখাচ্ছে মোবাইলে, প্রিন্ট করে আনা ছবি দেখাচ্ছে কাঁধে চড়ে! অনেকে তো গার্লফ্রেন্ডের পর্দানশীন ছবি সামনে রেখে ভিডিও করছিলো! এসব দেখে আমার Male Ego মাটিতে পড়ে গড়াঁগড়ি খেতে মনে চাচ্ছিলো। এইসব গাঁধারা হয়তো এটাও জানে না Ashes কিংবা জুনায়েদ ইভান যতোই "সে আমারে আমার হতেই দেই না " গান গেয়ে চিল্লাক না কেন, জুনায়েদ ইভান প্রেমিক হিসেবে সফল। কনসার্ট শেষে, সে তার প্রেমিকা(বর্তমান বউ) এর কাছেই ফিরে যাবে। এই গাঁধারদল গাঁজা খেয়ে মাঠেঘাটে পড়ে থাকবে। আমি মনে করি, এই গর্দভদের যে সকল মেয়ে ছেড়ে চলে গিয়েছে, সেই সকল মেয়েদের উল্টো শুকরিয়া আদায় করা উচিত যে, একটা গর্দভের সাথে বাকি জীবনটা কাটাতে হয়নি! প্রকাশ্যে এসে প্রাক্তনের ছবি পুড়ানো কিংবা প্রাইভেসি লঙ্ঘন করা কোনো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ নয়, এটা কাপুরুষোচিত আচরণ!
প্রেমিকা একটা গল্পের বইয়ের মতো। তার সাথে প্রতিটাদিন একটা করে পৃষ্ঠা উল্টানোর মতো করে নতুন একটা দিন শুরু করতে হয়। প্রতিটা ভালো স্মৃতি, মন্দ স্মৃতি, ভালো-লাগা, খারাপ লাগা এই গল্পের একেকটা চ্যাপ্টার। একটা মানুষকে ভালোবাসতে গেলে একটা জীবন যথেষ্ট নয়। অথচ আমরা ভালোবাসার মানুষ না চিনে, যত্তসব ধোঁকাবাজ আর হঠকারীদের নিয়ে পড়ে থাকি। ভালোবাসা একটা ডায়নামিক আর্ট, একটা শিল্পের মতো। প্রেমিক-প্রেমিকা সেখানে আর্টিস্ট। প্রেমিক কবি হলে, প্রেমিকা তার কবিতা, প্রাক্তন তার শূন্যতার শোকসভা। প্রেমিক গায়ক হলে, প্রেমিকা তার সুর, প্রাক্তন তার অভিমান। প্রেমিক লেখক হলে, প্রেমিকা তার নায়িকা, প্রাক্তন তার অপ্রকাশিত উপন্যাসের মুছে ফেলা চরিত্র ! ভালোবাসা এমনই হওয়া উচিত। আর প্রেম হওয়া উচিত অত্যন্ত ব্যক্তিগত।
প্রেম-ভালোবাসা-বিচ্ছেদ যদি কনসার্টে এসে গাঁজা খেয়ে টাল হয়ে প্রাক্তনের ছবি পুরানো হতো, কিংবা বর্তমানকে শো অফ করা হতো তাহলে আজকে জুনায়েদ ইভান, রাফারা আপনাদের সামনে এসে পার্ফরম করতো না। আপনাদের মতোই মানুষকে হ্যারাস করতো আর টাল হয়ে পড়ে থাকতো।
দিনশেষে একটা কথায় বলতে চাই, কিছু ভুলের জন্য সবসময় একপাক্ষিক সমালোচনা না করে, আয়োজকরা যে সম্মানটুকু প্রাপ্য তা যেন আমরা তাদের দেই। আর বহিরাগতদের বলতে চাই, একটা কনসার্ট দিয়ে ভার্সিটির স্টুডেন্টদের Judge করতে আসবেন না। এর আগের বছর যখন আপনাদের ছাড়া Platform আয়োজন করেছিলো এমন বাজে এক্সপেরিয়েন্স হয়নি তখন। বহিরাগতরা না আসলে এসবের আখড়াও হতো না।
মন্তব্যসমূহ