সুইসাইড, আ স্কুল অব থটস
এই যে প্রতিদিন এতো এতো সুইসাইডের কেস, কিন্তু কেন? অনেকে এদের পারিবারিক সমস্যা কিংবা দুর্বলচিত্তকে দায়ী করছে। আমার কাছে এসব বাদেও সব থেকে বড় যে কারণ তা এদেশের বাজে এডুকেশন সিস্টেম এবং ভার্চুয়াল লাইফকে মনে হয়।
আমরা এমন এক এডুকেশন সিস্টেমের মধ্য দিয়ে জীবনের ২৪-২৫ বছর কাটিয়ে দেয় যে,বের হওয়ার পর আর হিসেব মিলাতে পারি না এতোদিন কী শিখলাম,কিসের জন্য শিখলাম! যে ক্যারিয়ারের জন্য এতো পড়াশোনা অথচ সে ক্যারিয়ারের সাথে একাডেমিক লাইফের কোনো সামঞ্জস্য নেই। বিশেষ করে আমরা যারা ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়ছি, তাদের অবস্থা তো আরো বেশি নাজেহাল। মুখস্থ বিদ্যা ভালো লাগে না বলে জেনারেল আর মেডিকেলের প্রিপারেশন না নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এ আসা। স্কিল ডেভেলপমেন্ট আর ইনোভেশনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং এ আসা। অথচ এই সিস্টেমের ভেতর ঢুকে জানপ্রাণই হতাশ। এখানে যে যত শীট চাটতে পারে, তার সিজি ততো হাই! কোড মুখস্থ করে ল্যাব পাশ করতে হয়। আর জেনারেল সাবজেক্টে যারা পড়াশোনা করছে, তাদের অবস্থা তো আরো বেশি নাজুক। তারা অধিকাংশই ভার্সিটি লাইফটাকে চিল মনে করে আকাশে উড়তে উড়তে গ্র্যাজুয়েশনের পর ধপাস করে আকাশ থেকে মাটিতে পরে। অনেকেই বিসিএস ক্যাডার হওয়ার স্বপ্ন দেখে অথচ লাইব্রেরিতে বসে ২ঘন্টা পড়বার ধৈর্য্য নেই, দেশে কোন ইস্যু চলছে জিজ্ঞেস করলে আমতা আমতা করে। কারো কারো জেনারেল নলেজের দৌড় তো ওই ৫ বছর আগের সংস্করণ করা বইয়ের পাতা পর্যন্তই, এরপরের খবর কিচ্ছু জানে না। বিবিএ তে পড়ে অনেকে ব্যাংকার হওয়ার স্বপ্ন দেখে অথচ লাভ-ক্ষতির এক অংকে তিনবার আটকায়। স্টার্টআপ দিবে মানুষকে বলে বলে বেড়ায়, উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখে অথচ venture capital, MVP এর মানে জিজ্ঞেস করলে হা করে তাকিয়ে থাকে। অথচ এই গুনে খাওয়া শিক্ষাব্যবস্থার উপর আমরা নির্ভর করে বসে আছি পড়াশোনা শেষ করে চাকরি দেবে ভেবে। এই ভঙ্গুর সিস্টেম সম্ভ্রান্ত বেকার তৈরির কারখানা মাত্র। এই সিস্টেম থেকে গ্র্যাজুয়েটেড তকমা নিয়ে এমন এক বেকায়দা পড়তে হয় যে, আপনি না পারবেন রেস্টুরেন্টে ওয়েটারের চাকরি করার মতো স্কিল আর মানসিকতার রাখতে, না পারবেন নিজ পরিশ্রমে ব্যবসা দাঁড় করাতে। কারণ এই সিস্টেম আপনাকে সেই সময় আর সুযোগ কোনোটাই দিচ্ছে না। উল্টো দিবাস্বপ্নের বিলাসিতা দেখায় যে বই চাটলে মানুষের কাছ শিক্ষিত তকমা পাওয়া যাবে, পড়াশোনা শেষ করে ৬ডিজিটের স্যালারি, সুন্দরী বউ, বাড়ি আর গাড়ির।
Men, we are dreaming like an idiot...!!!
এবার আসি, ভার্চুয়াল লাইফ কীভাবে আমাদের সুইসাইডের প্রবণতা বাড়াচ্ছে। এই ফেসবুক-ইনস্ট্রার যুগে ৪ বছরের বাচ্চা থেকে শুরু করে ৪০ বছরের প্রাপ্তবয়স্ক সবাই একই নিউজফিড স্ক্রল করছে, কোনো ফিল্টারিং নেই। ২৫ বছরের একটা তরুণ কাপল ব্লগ, ওয়েডিং ফটোশুট, রোমান্স এসবকে যেভাবে গ্রহণ করবে ১৬ বছরের একটা কিশোর কিশোরী এসবকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে গ্রহণ করবে। এর ফলস্বরূপ এই যুগে বয়ঃসন্ধিতে সবেমাত্র পা রাখা কিশোর-কিশোরীরা প্রেম ভালোবাসা জিনিসটাকে খুব ফ্যান্টাসাইজ করে ভাবে। এরা ২৮ বছরের বিবাহিত যুবকের স্ট্রাগল ফেসটা দেখে না,দেখে শুধু রোমান্টিক লাইফটাকে। ভার্সিটির প্রেশারের গল্প শুনতে কিংবা দেখতে চাই না, দেখে শুধু ভার্সিটির লাইফ চিল আর চিল,আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখে বাইকের পেছনে মেয়ে নিয়ে ঘুরার।
আজকালের ছেলে মেয়েদের সাথে আমি কথা বলতে বসলে বেশ অবাক হই । আমার এই ২৩ বছরের জীবনে যতটুকু দুঃখকষ্ট আর বিরহ এর থেকে কয়েকগুণ বেশি যেন তাদের। এদের আঠারোয় না পা রাখা জীবনে ১ম,২য়, কারো কারো আবার ৩য় প্রেম এসে ধরে দিয়েছে! ১ম, ২য় ব্রেকআপ থেকে মুভ অন করতে না পারার হতাশা, ফ্যামিলির মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং, এই ছোট্ট জীবনে এতো এতো বিরহের গল্প আমি হতবাক হয়ে শুনি। এরা যখন বিশের কোঠায় পা রাখবে, তখন উপলব্ধি করতে পারবে জীবনে প্রেম ভালোবাসা বাদেও আরো কষ্ট আছে। ব্যক্তিত্বের যে বীজ আঠারোয় ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছে, সে কীভাবে এখন ফিনানশিয়ালি ক্রাইসিস, একাডেমিক প্রেশার, ক্যারিয়ার ফ্রাস্ট্রেশন, সর্বোপরি নিজের লাইফকে ব্যালেন্স করবে?
দিনশেষে আমার একটাই উপলব্ধি হয়, আমরা একটা emotionally fucked up প্রজন্মের দিকে আগাচ্ছি! এরা ক্রিয়েটিভ কাজ আর ক্রিটিক্যাল থিংকিং করার চেয়ে অলস বসে থাকার প্রতি বিলাসিতা প্রিয়!
এসবের ভিড়ে বাস্তবতা যেদিন দরজায় এসে কড়া নাড়বে, সেদিন পালানোর পথ হিসেবে জানালা দিয়ে লাফ দিয়ে সুইসাইড কিংবা পাখায় ঝুলে পড়ার মতো সাহস করা অসম্ভব কিছুই নয়!
মন্তব্যসমূহ