ছুটি শেষের বিকেল
২৭শে এপ্রিল বিকেল ৪টা বেজে ৪৫ মিনিট, ইদের ছুটি শেষ। ট্রেনে করে কুমিল্লা ফিরছিলাম। ট্রেনের ভেতর প্রচন্ড ভীড় আর প্রচুর গরম। অবশ্য আমার তাতে ভ্রুক্ষেপ ছিল না। আমি ট্রেনের খাবারের বগির জানালা দিয়ে অর্ধেক শরীর বের করে দিয়ে বাতাস খাচ্ছিলাম আর বাইরের প্রকৃতি দেখছিলাম তখন।
আকাশে মেঘ জমে একদম কালো হয়ে আসছে। মনে হচ্ছে কাল বৈশাখী ঝড় শুরু হবে কিছুক্ষণের মধ্যেই । ট্রেনের তাতে কোনো চিন্তায় নেই যেন, সে চলছে তার আপন গতিতে। দুপাশে ধানক্ষেত , মাঝখান দিয়ে বিলি কেটে যেন ট্রেন এগিয়ে চলছে। এখন ধানের মৌসুম, মাঠে কেউ কেউ ধান ভানছে , কেউ কেউ বন শুকাতে দিয়েছে, কেউ কেউ আবার গরু চড়াচ্ছে । তাদের সবার মাঝে ছুটোছুটি শুরু হয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। গৃহস্থের সপরিবার ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত। বৃষ্টি আসার আগে কষ্টের ধানগুলো ঘরে তুলবার এ যেন রীতিমতো এক সংগ্রাম। যুবতী মেয়েরা কোমরে ওড়না পেঁচিয়ে সমস্ত মাঠ পরিষ্কার করে ফেলছে ধান জমাবার নামে। আজকাল এমন সুন্দর দৃশ্য দেখবার সুযোগ মেলে না একদমই । লুঙ্গি পরা এক ছোট রাখাল , অবাধ্য এক বাছুরের পেছনে লাঠি নিয়ে দৌড়াচ্ছে আর আপ্রাণ চেষ্টা করছে বাছুরটাকে পালে ভীড়াবার জন্য।
ট্রেন যখন লোকালয়ে প্রবেশ করে তখন ধুলাবালি আর নিরাপত্তার স্বার্থে শরীর জানালার ভেতরে নিয়ে আসি। এতো সুন্দর একটা আবহাওয়া আর শীতল হাওয়া গাঁয়ে মাখার লোভ সামলাতে না পেরে মাথাটা একটু বের করে আনি জালালা দিয়ে। ট্রেন তখন বস্তির পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল। এই বৃষ্টির পানি যেন, বস্তির এই নোংরা পানির মাঝে বিশুদ্ধতার ছাপ। ট্রেনের সাথে তাল মিলিয়ে কিছু পিচ্চি ছেলেমেয়ে ছুটছিল, কী সুন্দর তাদের হাসি। শেষ কবে এতো নির্দ্বিধায় হেঁসে ছিলাম মনে নেই। এই অসুস্থ পরিবেশে সাময়িক সুস্থ এক শৈশব যেন দেখতে পাচ্ছিলাম আমি। হঠাৎ এক পিচ্চি আমাকে দেখে ভেংচি কাটে , আমিও তাকে দেখে ভেংচি কেটে হেঁসে দেই। সাথে থাকা বাচ্চাবাহিনী এই ব্যাপারটা দেখতে পায়, সবাই একই সাথে আনন্দে হৈঁহৈ করে ওঠে । মুহূর্তেই আমার মনটা ভালো হয়ে যায় !
দেখতে দেখতেই ট্রেন কুমিল্লা স্টেশন পৌঁছে যায়। ঝড় তখনও শুরু হয়নি। ফুটওভার ব্রীজের উপরে থাকা কিছু ছেলেমেয়েকে দেখলাম আগ্রহ নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। খুব সম্ভবত এরা ভিজবার জন্য অপেক্ষা করছে। সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসা স্টেশনের নিয়ন আলোয় প্রেয়সীর চোখে চোখ রেখে বৃষ্টিতে ভিজবার মাঝে এক অন্যরকম রোমান্টিসিজম কাজ করে, একরাশ মুগ্ধতার জন্ম নেয় তখন। অথচ তাদের দিকে স্টেশনের আড়চোখে তাকানো যাত্রীদের তা বুঝবার ক্ষমতা নেই !
আর এইদিকে আমি বেচারার কাঁধে ল্যাপটপের ব্যাগ আর হাতে ধরে রাখা কাপড়ের ব্যাগে কাপড়ের চেয়ে বই বেশি , এসব নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজবার প্রশ্নই আসে না। আমি বেচারা ধানক্ষেতের সেই গৃহস্থ আর স্টেশনের বৃষ্টির অপেক্ষায় থাকা প্রেমিকের মাঝামাঝি আঁটকে পড়া এক জীবন কাটাচ্ছি। আপাতত বৃষ্টি শুরু হওয়ার আগে বাসায় পৌঁছানোই আমার প্রাণপণ প্রায়াস !
মন্তব্যসমূহ