Monologue-01

শুক্রবার। বন্ধের দিন, কিন্তু আমার জন্য ব্যস্ততম একটা দিনের শুরু মাত্র। ট্রেনের সিটে বসে 'To-do list' এ task add করছি, আজকের সারাদিনের শিডিউল। ট্রেন কুমিল্লা শহরকে পিছনে ছেড়ে ছুটতে শুরু করলো। শিডিউল গুছানো শেষ করে playlist টা অন করে চোখ বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলাম। প্রতি সপ্তাহেই বাসায় যাই,তবে এ সপ্তাহে বাসায় যেতে কিছুটা ভয় পাচ্ছিলাম! কারণ বাসায় আপুরা এসেছে, ভাগ্নাভাগ্নিতে বাসা ভর্তি! বাসা এলোমেলো করার ক্ষেত্রে এই পিচ্চি বাহিনীর জুড়ি মেলা ভার! বিশেষ করে আমার টেবিল,টেবিলে রাখা প্রতিটা জিনিসপত্র,সেল্ফে রাখা বই, আর শো কেইসে রাখা আমার পুরষ্কার এবং ড্রয়ারে রাখা ডাইরি উপহারগুলো খুব যত্নসহকারে এলেমেলো করে দিয়ে যায়। পরবর্তী কিছু জিনিস বাসার পেছনে, জানালার বাইরে,খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করতে হয় আবার কিছু জিনিস নিখোঁজই রয়ে যায়। তবে সবথেকে সুখের বিষয় হলো সব আপুরা আসলে,একসাথে হলে আমার জন্য ইদের দিন। সবাই একসাথে বসে আড্ডা দেওয়া,পরিবারের পুরোনো স্মৃতিগুলো নিয়ে কথা তুলা, অনেক রকমের রান্নাবান্না করা, এসবকিছু শূন্য ঘরটাকে যেন পূন্য করে দেয়। আপুরা আমার জন্য নিয়ামত বলা যাই। উনাদের এতো সেবাযত্ন, প্রায়োরিটি আমাকে ইতস্ততবোধ করায়। বাসায় হোক কিংবা মেস সবজায়গা আমি একাই নিজের মতো থাকি সবসময়, পিউর ব্যাচেলর বলা যাই। যখন এই আমাকে আপুরা চুলের যত্ন নিতে বলে,সকালে ঘুম থেকে উঠার পরপরই গরম চায়ের কাপ সামনে এনে দেয়, স্বাস্থ্যের যত্ন নিতে লম্বা রুটিন করে দেয়, তখন ইতস্তত লাগবেই আমার মতো পিউর, কেয়ারলেস ছেলেটার জন্য। আমার মনে হয় না পৃথিবীতে এমন কোনো ছেলে আছে যার মা এবং বোনদের প্রতি সম্মান আর ভালোবাসা আছে, সে অন্য কোনো মেয়ে কিংবা নারী জাতির প্রতি অসম্মান আর ঘৃণা ছড়াতে পারে! আমার মতো অন্তত পিউর ব্যাচেলর তো অন্তত না-ই,যার প্রতিটা সিদ্ধান্তে বোনদের পরামর্শ দরকার মনে করি! বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই আমার মোবাইল আর ল্যাপটপ পিচ্চি বাহিনীর দখলে। একদল হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেইম খেলতে, আরেকদল ল্যাপটপ। তাদের সাথে হৈচৈ চিল্লাফাল্লা করতে ভালোই লাগে আমার কিন্তু আমার মোবাইল আর ল্যাপটপ বেচারার উপর সেই দখল যাই! আজ শনিবার, সকাল ১০টা, চোখ খুলে দেখি ছোট আপুর মেয়ে(বাহিনীর সবথেকে ছোট সদস্য, নাম সিনহা) ল্যাপটপ এর উপর ভর দিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে আছে। খুব মনোযোগ দিয়ে চেষ্টা করছে আমার ঘুম ভাঙ্গানোর,যাতে ল্যাপটপটা অন করে দেই,উনি কার্টুন দেখবে। হুড়মুড় করে উঠে ল্যাপটপ ওপেন করে দেখলাম ডিসপ্লে ঠিক আছে কি না,নাহ ঠিকই আছে। এই ছোট দলপতি উনি যা চাই তা না দেওয়া পর্যন্ত শান্ত হয় না, দিলাম ল্যাপটপ অন করে। তারপর গেলাম ব্রাশ করতে। ব্রাশ করছি আর উঠানের পরিবেশ দেখতেছি, উনি একদম দু'হাত গুটিয়ে মাথা নুইয়ে বলল,"পিঞ্চি(প্রিন্স) মামা মোবাইল"। কতক্ষণ দুষ্টুমি করে দিলাম উনাকে মোবাইল। "কলম, দাও",বুঝলাম উনি এখন আমার মোবাইলের S-Pen নিয়ে লিখতে বসবে। মোবাইলের এই S-pen টা আমার থেকে বেশি ব্যবহার উনিই করেছে। কিনার পর দেখাতে চাই নি S-Pen টা ,কিন্তু উনি আমার মোবাইলের বিশেষজ্ঞ,নিজেই কিভাবে কিভাবে যেন আবিষ্কার করে ফেলেছিলো ! ব্রাশ শেষ করে রুমে গিয়ে দেখি মাশাল্লাহ ল্যাপটপ উল্টাপাল্টা টিপে কোথায় যেন নিয়ে রেখেছে, মেকআপ বক্স থেকে সব পাউডার কিবোর্ডের উপর পড়ে আছে! সর্বনাশ, তাড়াতাড়ি ল্যাপটপ ক্লিন করতে বসলাম। উনাকে ঢেকে এনে ধমক দিয়ে বললাম কি করেছো এসব তুমি, মামার ল্যাপটপ নষ্ট করে ফেলেছো তুমি, এখন কে ঠিক করবে এটা?" উনি একটা দুষ্টু হাসি দিয়ে ," তুমি ঠিক করবা" বলেই পাশের রুমে দৌঁড়। ল্যাপটপ ঠিকঠাক করে আপুদের সাথে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। দুপুরের দিকে বাসা থেকে বের হয়ে যাবো। পিচ্চি বাহিনীর সাথে কতক্ষণ হৈ-হুল্লোড় করে রেডি হয়ে বের হয়ে পড়েছি। একটা একঘেয়েমির ক্লান্ত বিকেল শেষ করে যখন সন্ধ্যায় এসে ট্রেনে উঠলাম, মোবাইলটা হাতে নিয়ে ' To-do list' এ কমপ্লিট হওয়া task গুলো মার্ক করছিলাম। মন একই সাথে ঘুমে ক্লান্ত এবং পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় মগ্ন। ৩ ক্রেডিটের পরীক্ষা তাও এলগরিদম, কিছুই পড়া হয় নাই! মেসে গিয়ে কিভাবে পড়া গোছাবো সেই জন্য Notepad টা খুলতেই রিসেন্ট tab টাই, সিনহার(পিচ্চি গ্যাংয়ের সদস্য) আঁকিবুঁকি চোখে পড়লো। tab টাই ঢুকতেই মনটা ভালো হয়ে গেল, কতক্ষণের জন্য নিজের সব দুশ্চিন্তা আর ক্লান্তি ভুলে আপন মনেই হাসতে শুরু করলাম! একটা হ্যাংলাপাতলা ক্যারাক্টার আঁকা পেইজটায়,পাশে লেখা ' মামা ভাল'! লেখাটা সিয়েম,সিভা,জ্যোতি(বাহিনীর বড় অন্যান্য সদস্য) এদের কারো কাজ। আমি বাচ্চাকাচ্চাদের সাথে কখনো রাগ দেখাতে পারি না। ধমকও হাসিমুখে দিয়ে ফেলি৷ যার ফলস্বরূপ, পিচ্চিগুলো আমাকে সিরিয়াসলি ভাবে নেয় না। কোনো একটা অদ্ভুত কারণেই হোক কিংবা উপরওয়ালার উপহার বলা যায়,এই একটা জিনিস আমি উপলব্ধি করি যে,"পজিটিভ মাইন্ডসেট রাখলে তা করার জন্য পজিটিভ এনার্জি প্রকৃতিই যোগাড় করে দেয়"। Monologue-01 ২৩ই জুলাই ২০২২ শনিবার,সন্ধ্যা ৭ঃ৫০।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আপনার ব্যক্তিগত জীবন অনলাইনে বেচা-কেনা হচ্ছে

Dear GEN-Z

QuotaReformProtest