ডাইরি ও আত্মসন্তুষ্টি !!!

ক্লাস সেভেন থেকে ডাইরি লিখা শুরু করি। অবশ্য ডাইরি লিখার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম বড় কাকার থেকে। উনার ডাইরির অনেক গল্পই কাকী আমাকে শুনিয়েছেন বহুবার। তারপর একদিন পত্রিকায় আনা ফ্রাঙ্কের ডাইরি সম্পর্কে জানা। এভাবে ডাইরি লিখার আগ্রহ জাগে। সর্বপ্রথম ডাইরিটা ছিল রিমা আপুর দেওয়া ছোট একটা ঝিকিমিকি লক ডাইরি। ডাইরিটার লকটা যদিও তেমন সিকিউরড ছিল না, তারপরও প্রতিবার লিখে ডাইরিটা লক করে কতো যত্নসহকারেই না চাবিটা লুকিয়ে রাখতাম! তখন থেকে ডাইরিতে নিজের স্বপ্নগুলো, প্রাত্যহিক ঘটা ঘটনাগুলো লিখা শুরু করি। নিজেকে গুছাতে থাকি লিখার মাধ্যমে। ডাইরিতে লিখা অধিকাংশ স্বপ্নগুলো যেন কী এক কাকতালীয়ভাবেই পূর্ণতা পাচ্ছিলো! এর দুটো কারণ হতে পারে। এক, ছোটবেলা থেকেই হয়তো আমার বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন জাগেনি কখনোই। দুই, তখন হয়তো অবচেতন মন নিজ সীমার মধ্যে স্বপ্নগুলো লিখে যায়৷ ক্লাস এইটের ডাইরির পাতায় লিখা একটা লাইন "আম্মা সন্তুষ্ট হয় এমন একটা রেজাল্ট করতেই হবে আমাকে, এপ্লাস গোল্ডেন এবার যেটাই হোক"। আমাকে গোল্ডেনই পেতে হবে কিংবা এপ্লাস এমন কোনো চাপও কখনো পরিবার থেকে দেয় নি। সে বার গোল্ডেন পাইনি, এ প্লাস এসেছিলো৷ টেলেন্টপুল বৃত্তি মিস, সাধারণ গ্রেডে বৃত্তি এসেছিলো। বেস্ট রেজাল্ট হয়তো আম্মাকে দিতে পারিনি, কিন্তু রেজাল্টের পর আম্মার খুশি দেখে কে। সেই দিনের সন্ধ্যেয় আম্মা তেলের পিঠা বানিয়েছিলো, যদিও আম্মার রান্নার হাত ছিলো খুবই কাঁচা। তবুও অমৃত মনে হয়েছিলো সেদিন ! কলেজে উঠার পর দেখলাম টেক আর সেল্ফ ডেভেলপমেন্ট রিলেটেড জিনিসগুলো আমাকে খুব টানে। ফ্রিল্যান্সিং, গল্প লিখা, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, পাবলিক স্পিকিং, তখন কতো কিছু করে ফেলার চিন্তাভাবনা ঘুরঘুর করতো মাথায়। তারপর ভেবে দেখলাম লাইফে স্টিক হয়ে থাকতে পারি না আমি কোনো কিছুতেই। পড়াশোনা তো করছি, এরপর কী করবো? এইচএসসি এর পর যখন এডমিশনের জন্য দৌড়ঝাঁপ করছিলাম, তখন ডাইরিতে লিখে ছিলাম," অনার্সে আমি এমন একটা সাবজেক্ট চাই, যা টেক রিলেটেড আর যেখানে আমার সন্তুষ্টি থাকবে। এই সাবজেক্টের যত পারি এক্সপ্লোর করতে চাই। তবে পিউর সাবজেক্ট যাতে জীবনেও না আসে। ইশ্ রুয়েটে সিএসই এসে পড়তো! ইনশাআল্লাহ এর জন্য যত পরিশ্রম করা লাগে করে যাব "। এডমিশনের পর রুয়েটে চান্স আসলো ঠিকই কিন্তু সিএসই আসলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কি এক কনফিউশান! ডাইরি যেন ডেথ নোটের সাইড রোল প্লে করতেছিলো! ভার্সিটিতে উঠার পর দেখি, আশেপাশের মানুষগুলোর মাতামাতি, মানুষের উচ্চাকাঙ্খা আর পরিবারের চাপে সবার ক্যারিয়ার প্ল্যান আর আমার ক্যারিয়ার প্ল্যান এর মাঝে আকাশ পাতাল ফারাক। যেই জায়গায় সবকিছু এক্সপ্লোর করার ইচ্ছে ছিলো সেই জায়গায় প্রতিনিয়ত মনে হতে লাগলো নিজেকে কোথায় যেন এক কেন্দ্রবিন্দুতে আবদ্ধ করে ফেলছি! এখন ডাইরিতে যা লিখি তা সিক্রেটই থাকুক🙂 দেখি, অবচেতন মন কী লিখে যায়৷ হয়তো আজ থেকে পাঁচ-ছয় বছর পর যখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ডাইরিটা নিয়ে বসবো তখন হয়তো অবচেতন মনের সাথে বুঝাপড়া চলবে। তবে যা-ই হবে, তা ভালো হবে এতোটুকু ভরসা আছে। অন্তত এতোগুলো ডাইরি তা-ই সাক্ষী দেয়! ছোটবেলা থেকে ডাইরি লিখে আসছি। ভার্সিটিতে উঠার পর ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়ার কারণে এখন আর ওরকমভাবে লিখা হয় না। তীব্র মন খারাপ কিংবা খুব বেশি ভালো লাগা কাজ না করলে ডাইরি লিখতে বসা হয় না। ডাইরি লিখার একটা সর্বোচ্চ ভালো দিক হলো, এই পৃষ্ঠাগুলো আমায় নিজেকে মাপতে সাহায্য করে। জীবনে যখনই ভালো কিংবা খারাপ সময় আসে, তখন যাতে অহংকারী কিংবা দুর্বল হয়ে না পড়ি সে জন্য ডাইরিগুলো আমাকে অনেক সাহায্য করে। ডাইরি নিয়ে বসলে উপলব্ধি করতে পারি," এখন আমি যা, তা হয়তো সাময়িক আমি, কিন্তু এই পৃষ্ঠাগুলোর আমি বিগত সারাজীবনের আমি!"

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আপনার ব্যক্তিগত জীবন অনলাইনে বেচা-কেনা হচ্ছে

Dear GEN-Z

QuotaReformProtest