Monologue-11

রাত ১১টা ২০। লোকাল ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে বাইরের ঘন কুয়াশার দিকে তাকিয়ে আছি। গাড়ি প্রচন্ড ভীড়, পুরো বগিতে কারেন্ট নেই, পূর্ণিমার শীতল আলো গাঁয়ে এসে পড়ছে। ২০২২-এর শুরু থেকে wishlist-এ এড করে রেখেছিলাম একদিন রাতে লোকাল ট্রেনে জার্নি করবো,সেদিন বাইরে থাকবে নীল জ্যোৎস্না, ট্রেনের বগি থাকবে অন্ধকার! লোকাল ট্রেনের বগিগুলোয় অধিকাংশ সময়ই ইলেক্ট্রিসিটি থাকে না, থাকলেও গুটিকয়েক কম্পার্টমেন্টে। আমি খুঁজে খুঁজে অন্ধকার বগিটাই উঠলাম। ট্রেন স্টেশন ছাড়লো, কানে এয়ারপডটাই এইদিনের জন্য বাছাই করে রাখা প্লেলিস্টটা চলছে। এই মুহুর্তগুলোয় এসে মনে হয় ছেলে হয়ে জন্মানোটা কতোটা সৌভাগ্যের ! নয়তো মাঝরাত হাঁটতে বের হওয়া, আড্ডা দিয়ে রাতে দেরিতে বাসায় ফিরা, বন্ধুদের সাথে হুটহাট ট্যুর প্ল্যান, মাঝ নদীতে নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ করে পূর্ণিমা দেখা, এই যে ট্রেন জার্নি, wishlist-এর এমন অনেক ইচ্ছেগুলো অপূর্ণই থেকে যেতো হয়তো ! কুয়াশা কেঁটে ট্রেন সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। দূরে কুয়াশার মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বর্ডারের কাঁটা তারের পাশে নিয়ন বাতির আলোগুলোর আকৃতিকে একটা বিশাল সাপ মনে হচ্ছে। নাকে সিগারেট এর গন্ধ আসায় বর্ডার এর দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ডানে তাকালাম। ট্রেনের দরজায় বসে থাকা এক তরুণ আপন মনে সিগারেট টানছে আর আঁয়েশ করে সিগারেট এর ধোঁয়াটা বাইরে ছাড়ছে। কোনো রকমে বিরক্তি চাপা দিয়ে বললাম, "ভাই সিগারেটটা কাইন্ডলি তাড়াতাড়ি শেষ করলে ভালো হতো, সিগারেট এর ধোঁয়া আমার সহ্য হয় না।" বেচারা হয়তো আমার বিরক্তিভাব বুঝতে পেরেছে, তাই সরি বলে কয়েকটা পাফ নিয়ে সিগারেটটা ফেলে দিলো সাথে সাথেই। লোকাল ট্রেনের যাত্রীকে এতোটা বিনয়ী হতে দেখে কিছুটা অবাকই হলাম। লোকাল ট্রেনের রেগুলার যাত্রী মনে হলো না উনাকে। পরবর্তীতে কথায় কথায় জানতে পারলাম প্রিয় মানুষটার সাথে সকালে দেখা করার কথা উনার, সকালের ট্রেন ধরলে লেইট হয়ে যেতে পারে তাই রাতের লোকাল ট্রেন ধরা। রাতে থাকবেন কোথায় জিজ্ঞেস করায় বলল,"ট্রেন ওই এলাকায় যাইতে যাইতে ভোর ভাই, আজকে আর এমনিতেও ঘুম হইবো না "। বাহ, ভালোবাসায় কতো পাংচুয়ালিটি, প্রেম মানুষকে কতো ম্যাচুউরড করে!কই যাইবেন জিজ্ঞেস করায়, আমি যখন বললাম, "আমার কোনো ইমার্জেন্সি নেই, অনেক দিনের উইশ ছিল আজকের জার্নিটা"।উনি যে কিছুটা অবাক হলো, তা উনার হাঁসি দেখেই বুঝতে পারলাম। বাইরে তখন ভীষণ সুন্দর পূর্ণিমা সাথে অস্পষ্ট কুয়াশা। ছোটবেলা থেকে এই একটা জিনিসের প্রতি মোহ আমি এখনোও কাটিয়ে উঠতে পারি নি। আমার মতে দুইটা স্টেজে মানুষ চাঁদের প্রতি ভীষণ রকমের আকৃষ্ট হয়ে পড়ে, যাকে আমরা বইয়ের ভাষায় 'চন্দ্রাহত' হওয়া বুঝি। এক,প্রথম প্রেমে পড়ার সময়। দুই, সদ্য প্রিয়জন হারানোর পর। যারা কখনো এই দুই স্টেজের একটাও পার করে নি তারা পূর্ণিমাবিলাসী হতে পারে না বলে আমার ধারণা! স্কুল লাইফে আমার কাছে পূর্ণিমা মানেই ছিলো আম্মার বলা রূপকথার রাত কিংবা গল্পের বইয়ের কোনো এক চরিত্রের সন্ধান। আর এখন এই সময়টায় এসে পূর্ণিমা, চাঁদের আলো, নীল জ্যোৎস্না মানেই ব্যস্ত সময়ে বিলাসী কোনো এক শখ কিংবা অতীতের স্মৃতিচারণ। এখন পূর্ণিমাবিলাসে কেমন যেন এক বিশাল শূন্যতা কাজ করে। কি জানি! হয়তো এখন হারানোর পাল্লাটা এতোটাই ভারী হয়ে পড়েছে যে, প্রাপ্তিগুলোকে উপলব্ধি করতে পারি না। ১ টা ৮ মিনিট। ট্রেন আখাউড়া স্টেশন প্রবেশ করছে। ট্রেন থেকে নেমে রিকশা নিলাম। রিকশায় বসে বসে উইশ লিস্টের ইন-কমপ্লিট টাস্কটায় Done-এ ক্লিক করতে করতে উইশ করছি শেষ বয়সে পৌঁছানোর পর্যন্ত এভাবেই যেন একের পর এক উইশগুলোর পাশে done লিখতে পারি। এ এক অন্যরকম ভালো লাগা, এক আকাশ সমান শূন্যতার এই মনে যেন পূর্ণতার সাময়িক জোয়ার। নিজেকে কিছু সময়ের জন্য সবচেয়ে সুখী মানুষদের একজন মনে হয় তখন!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আপনার ব্যক্তিগত জীবন অনলাইনে বেচা-কেনা হচ্ছে

Dear GEN-Z

QuotaReformProtest