Monologue-07
ট্রেনে জানালার পাশের সিটটায় বসে আছি, ট্রেন যে দিকে ছুটছে তার বিপরীত দিকে মুখ করে। ট্রেন যখন স্টেশন ছেড়ে ধীরে ধীরে ছুটতে শুরু করলো, মনে হচ্ছিলো যেন, সবকিছুকে প্রচন্ড বেগে পেছনে ফেলে ছুটে যাচ্ছি। অনেকদিন পর নিজেকে কেমন যেন হালকা অনুভব করছি। টিউশন,ক্লাস, এসাইনমেন্ট, প্রেজেন্টেশন, মানসিক স্ট্রেস, হিসেব নিকেশ সবকিছু থেকে যেন সাময়িক মুক্তি!
ট্রেন তার সর্বোচ্চ গতি দিয়ে পরবর্তী স্টেশনের সাথে দূরত্ব গুছাচ্ছে। আর এইদিকে আমার মাথায় শ'খানে ভাবনার উদয় হচ্ছে।
আচ্ছা আমরা মানুষ কি কখনো বেকার থাকতে পারি? আমার তো মনে হয় না ! পার্থক্য এই যে কিছু কর্মের জন্য আমরা পার্থিব প্রশংসা কিংবা অর্থ পেয়ে থাকি আর কিছু কর্মের জন্য পায় আত্মিক কিংবা মানসিক শান্তি কিংবা অশান্তি। আমরা প্রতিনিয়ত কিছু না কিছু করছি। আচ্ছা তার মানে কি এই যে যদি কোনো কর্মের জন্য আমরা অর্থ না লাভ করি তাহলে আমরা বেকার? কিন্তু বেকার মানে তো যতটুকু জানি যার কোনো কর্ম নেই তাকে বুঝায় ! ব্যাপারটা কেমন যেন সাংঘর্ষিক হয়ে গেল না? এই যেমন ধরেন আমি এখন চলন্ত ট্রেনে বসে ভাবছি, এলোমেলো চিন্তাগুলো সাজাচ্ছি নিজের মতো করে, বাতাসে হাত বুলিয়ে শুন্যে বিলি কাটছি। এতে আমার মানসিক শান্তি মিলছে, ভাবনাগুলো গুছিয়ে নিতে সহজ হচ্ছে। তাহলে আমি তো কিছু না কিছু করছি, এখন কি আমি বেকার???
এক ছোট ভাই প্রশ্ন করেছিলো," love life or Good Result?"
ছোটবেলা স্কুল থেকে ফিরে বাসার গেইটে এসে যখন দেখতাম আম্মা আমার অপেক্ষায় পথ চেয়ে আছে না খেয়ে, আমি আসলে খাবো বলে। তখন দূর থেকে অভিযোগের দৃষ্টিতে চেয়ে দেখতাম ভালোবাসার স্বচ্ছ উদাহরণ। বড় হওয়ার পর যখন পড়াশোনার জন্য বাসার বাইরে চলে আসলাম, আম্মা তখন বিদায় দেওয়ার সময় ঘর থেকে গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে যেত, যতক্ষণ আমার অবয়ব দেখা যেত আম্মা বাড়ির গেইটে ততক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতো। রেজাল্ট খারাপ হলো, রেজাল্ট ভালো হলো, ভার্সিটিতে চান্স পেলাম সো কলড শুভাকাঙ্ক্ষী মানুষগুলোর এক একবার এক এক রুপ পাল্টাতে দেখলাম। কিন্তু আম্মা আর আপুদের ভালোবাসা আর স্নেহের জায়গায় এতটুকুও কমতি দেখি নি। বরং আমার খারাপ সময়গুলোয় যেন এই নিঃস্বার্থ মানুষগুলো আমার প্রতি আরো বেশি যত্নবান হয়েছে। স্ট্রেস আর অসহায় হয়ে যখন রুমে বসে কান্না করছিলাম, বড় আপু অসুস্থ শরীর নিয়ে রান্নাবান্না করে ৭তলা সিড়ি বেয়ে নিজ হাতে খাইয়ে দিয়ে গিয়েছিলো। ঠান্ডায় যখন গলা দিয়ে কথা বের হতো না, জ্বর আর মাথা ব্যাথা নিয়ে যেদিনগুলোয় বিছানায় ছটফট করতাম সেদিন গুলোয় প্রিয়মানুষটার সাপোর্ট, আস্থা আর যত্ন আমাকে পুনরায় শক্তি যোগাত। আমার খারাপ রেজাল্টের সময়ও এই মানুষগুলো বিন্দুমাত্র পাল্টায় নি বরং ভালোবাসা আর যত্ন আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সেদিন থেকে বুঝে গিয়েছি পৃথিবীতে ভালোবাসার মতো পবিত্র আর কন্সটেন্ট আর কিছু নেই!
এক জুনিয়র আপু জানতে চেয়েছিলো, " প্রতীক্ষা নাকি প্রত্যাশা?"। আমার মনে হয় প্রত্যাশা শব্দটা শুধুমাত্র নিজের জন্য, একান্তই নিজের সবকিছুতে নিজের প্রত্যাশা করা উচিত। অন্যের প্রতি কোনো প্রত্যাশা রাখা কিংবা অন্যকে প্রত্যাশায় রাখা একটা বড়সড় অপরাধ। জীবনে সময় অনেক মূল্যবান, প্রত্যাশায় নিজের অথবা কারো সময় নষ্ট করা, মার্ডার করার মতো অপরাধ! তাই এই প্রত্যাশা শুধুমাত্র নিজেকে কেন্দ্র করে নিজের সাথে হওয়া উচিত, যার নাম প্রতীক্ষা!
ইনবক্সে কেউ একজন জানতে চেয়েছিলো,"কখনোও যদি মিসির আলী এবং হিমু এই দুজনের মধ্যে একজন হওয়ার সুযোগ পান কোনটি হবেন? " আমি বলেছিলাম আমি একজনও হতে চাই না। কারণ দু'জনের একজনও হতে গেলে আমাকে আমার প্রিয় মানুষটাকে বিসর্জন দিতে হবে, যা আমার পক্ষে সম্ভব না। হুমায়ুন আহমেদ নিজে দুই বিয়ে করলেও তার কালজয়ী উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলো উনি সবসময় চিরকুমার রেখেছেন, কারণ আমাদের সাইকোলজিই এমন যে নিজের ধর্ম কিংবা কালচার বাদে বাকি সবকিছুতেই আমাদের আগ্রহ বাড়ে। এই যেমন ধরেন আপনার ধর্ম আপনাকে সিগারেট এবং মদ খেতে নিষেধ করেছে কিন্তু আপনার এসবেই আগ্রহ! আমার তো ধারণা আল্লাহ যদি মানুষকে নামাজ পড়তে নিষেধ করতো তাহলে মানুষ আরো আগ্রহ নিয়ে নামাজ পড়তো। তাই আমাদের হুমায়ুন আহমেদকে সিরিয়াসলি নেওয়া উচিত না, আমিও নেই না।
লিখতে লিখতে ভোর হয়ে যাচ্ছে। ট্রেনে বসে ভোর হতে দেখার সৌভাগ্য আমার মাত্র কয়েকবারই হয়েছে। চলন্ত ট্রেনে বসে ধীরে ধীরে ভোর হতে দেখার ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং। সচরাচর স্থির হয়ে বারান্দায় কিংবা ছাঁদে কফির মগ নিয়ে ভোর দেখা হয়, ব্যাপারটার মধ্যে একটা মেডিটেশন কাজ করে। কিন্তু ট্রেনের ক্ষেত্রে বিষয়টা সম্পূর্ণ উল্টো, মনে হয় পুরো দুনিয়া আপনাকে নিয়ে ছুটছে অথচ সূর্য বেচারা একটুও মাথা ঘামাচ্ছে না আপনাকে নিয়ে, সে তার আপন গতিতেই নিজের প্রতিদিনের ডিউটি পালন করে যাচ্ছে।
#Monologue
15/09/22
Thursday,5:25am

মন্তব্যসমূহ