ছেলে মানুষের ইগো থাকতে নেই, যা থাকা দরকার তা হলো "self - respect" !

সিএনজির মাঝখানের সিটে বসে আছি। বাম পাশের সিটে একটা হকার ছেলে এসে উঁকি দিলো,বয়স ১৫-১৬, সাথে বাঁশের কঁঞ্চি দিয়ে বানানো একটা ফ্রেম যেখানে টিঁপের পাতা,চুড়ি,আরো নানা সাঁজগোজের জিনিস ক্লিপ দিয়ে এঁটে রেখেছে। আমাকে দেখে প্রথমে ইতস্ততবোধ করছিলো উঠবে কিনা। আমি হাসিমুখ নিয়ে বললাম,"সমস্যা নেই।তোমার জিনিসগুলো এখানে রাখতে পারবে, উঠে পরো"। কিছুটা স্বস্তির সুরে সে বলল, "আসলে ভাই সামনেই বইতাম কিন্তু ব্যাগে কাঁচের মালও আছে(হাঁসি)"। আমি বললাম,"আরেহ সমস্যা নেই। পেছনেই জায়গা হবে, আমার সমস্যা হবে না "। সিএনজি ছাড়তে তখনো আরো দুজন প্যাসেঞ্জার লাগবে। তাই সময় কাটানোর জন্য ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলাম,"বেচাকেনা শেষ? বাড়ি ফিরতেছো নাকি?"। সে হেঁসে উত্তর দিলো," হ্যা আজকের মতো বেঁচা বিক্রি শেষ, বাড়িত যাইতেছি। আপনার বাড়িও কি কুমিল্লা? "।
আমি বললাম," না,কুমিল্লা পড়াশোনার জন্য থাকা হয়,বাড়ি আখাউড়াতে।"
এরপর অনেক কথা হয়েছে আমাদের মাঝে। কথায় কথায় জানতে পারলাম আমার মতো ওর ও ট্রেন মিস হয়েছে।জানতে পারলাম সারাদিন ফেরি করে যা আয় হয় তা তিনটা ভাগ হয়, একটা ভাগ দুপুরে হোটেলে খাওয়ার জন্য, দ্বিতীয় ভাগ বাসায় যাওয়ার সময় চাল-ডাল কিনে নেওয়ার জন্য, তৃতীয় ভাগ ব্যবসার মালামাল কিনার জন্য। মাঝে মাঝে ট্রেন মিস করলে বাড়ি ফিরার জন্য যে এক্সট্রা টাকাটা জরিমানা হয় তা দ্বিতীয় ভাগ থেকে ভর্তুকি দিতে হয়। এর জন্য মাঝে মাঝে বাজার না নিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয় তাকে। সেদিন সে আর মায়ের চোখের দিকে তাকাতে পারে না,চুপচাপ গিয়ে শুয়ে পড়ে পাটি বিছিয়ে, আর অপেক্ষা করে কখন সকাল হবে, বেড়িয়ে পড়বে লজ্জাবোধ থেকে।
বয়সে আমার থেকে এতো ছোট একটা ছেলের কাছ থেকে এরকম কথা শুনে আমি একদম আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। যে বয়সে থাকতে পরিবার কি জিনিস বুঝতামই না,সেই বয়সে এসে একটা ছেলে পরিবারের হাল ধরছে, আবার পরিবারের চাহিদা মেটাতে না পেরে অনুতপ্তও হচ্ছে ! ভাবা যায়?
নামার সময় ওকে ভাড়া দিতে মানা করলাম। জোড়াজুড়ি করেও ওর ভাড়া আমাকে দিতে দিলো না। ওর আশি টাকা ভাড়া ও নিজেই দিয়ে হাঁসি মুখে বিদায় নিয়ে চলে গেল। সিএনজি ড্রাইভার মামা আমার দিকে তাকিয়ে হেঁসে দিলেন। বললেন," মামা, ও আমার এলাকারই।ছোটবেলায় হের বাপ হেরে আর হের মায়েরে ফালাইয়া দিয়া নিরুদ্দেশ হইয়া যায়।এরপর থেকেই হের মা মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করতো, হে বড় হওয়ার পর, হের মায়েরে আর কাজ করতে দেয় নাই। ও সংসারের হাল ধরছে।"
ড্রাইভার মামার ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে পার্কের সামনে দিয়ে হাঁটছি। হঠাৎ করে কেন জানি মনটা খারাপ হয়ে গেল। রিকশা ডেকে,রিকশায় উঠে বসলাম।
হঠাৎ নিজেকে কেমন যেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মনে হচ্ছে। মা'কে নিয়ে নিজের অপরিপূর্ণ অনেক ইচ্ছে আর স্বপ্নের কথা মনে পড়ে গেল। যেই অপূর্ণ ইচ্ছে আর স্বপ্ন আর কখনো পূর্ণতা পাবে না, যতদিন বেঁচে থাকবো আফসোস হয়ে রয়ে যাবে।
ছেলে মানুষের ইগো থাকতে নেই, যা থাকা দরকার তা হলো "self - respect"। এই ছেলেটার মধ্যে কোথায় যেন আমি আত্মসম্মানবোধটা খুঁজে পাচ্ছি। যেভাবে কথাগুলো বলে গেল কোথাও কোনো ইগো ছিল না।সাদামাটা স্বীকারোক্তি।
এই ছেলেগুলোর কাছে আসলেই আমি কিছুই না। নিজের ইগোর জন্য আমাদের অনেক কিছু হারাতে হয়। আর আত্মসম্মানবোধ নেই বলে,একটা ব্যক্তিত্বহীন মানুষ হয়ে থেকে যেতে হয় আমাদের।
মন্তব্যসমূহ