আমরা একটা ইনফিনিটি লুপ
রাত ৯ঃ০৫।কুমিল্লা রেলওয়ে স্টেশন এর ফুটওভার ব্রীজের ওপর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছি এক ভাইয়ার সাথে দেখা করার জন্য। অনেকদিন ধরে দেখা করবো করবো করে আর সময় হয়ে উঠছিল না দু'জনের কারোর ই। তাই আজকে আগে আগে এসে অপেক্ষা করছি যাতে আমার আগে এসে উনাকে অপেক্ষা করতে না হয়।
৯ঃ১৩,ঘড়ির দিকের থেকে চোখ তুলে আকাশের দিকে তাকালাম বৃষ্টি নামবে এমন একটা ভাব,বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ভাইয়ার সাথে দেখা করার টাইম ৯ঃ৩০। উনি আসতে পারবে তো?
ফুটওভার ব্রিজটা থেকে স্টেশনটাকে অন্য রকম লাগে! এই জায়গাটা কুমিল্লার মানুষের কাছে একটা ছোটোখাটো পার্কে পরিণত হয়েছে। ভোরে এখানে মানুষ হাঁটতে আসে,দুপুর কিংবা বিকেলে স্কুল কলেজে ছাত্রছাত্রীরা আসে আড্ডা দিতে আর রাত হলে দিনের কোলাহলের পরিবর্তে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা রূপ নেয়!
পরবর্তী যাত্রীবাহী ট্রেন খুব সম্ভবত মাঝরাতে। এতো বড় স্টেশনটা একদম ফাঁকা। কেমন যেন অদ্ভুত এক শূন্যতা কাজ করছে প্ল্যাটফর্মগুলোয়। ২নং প্ল্যাটফর্মে কাঁথা বিছিয়ে একটা পরিবারকে দেখলাম নির্বিঘ্নে ঘুমিয়ে আছে।পরিবারটা আমার চেনা। ভিক্ষাবৃত্তিই তাদের পেশা। সারাদিন এতো বড় স্টেশনটায় এ মাথা থেকে ও মাথা অন্ধ স্বামী আর পিচ্চি বাচ্চাটাকে নিয়ে মহিলা ভিক্ষা করে বেড়ায়। কি নির্বিঘ্নে ঘুমাচ্ছে স্বামী স্ত্রী!
আচ্ছা, এই মহিলা কি স্বামীর কাছে শাড়ি চুড়ি কিংবা ঘুমানোর মতো একটা নিদিষ্ট আশ্রয় কখনো চাই না?
এই মহিলা তো চাইলেও এই অন্ধ মানুষটিকে ছেড়ে চলে যেতে পারে, ভালো ভবিষ্যতের আশায়। উনি কি কখনো ছেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে?
কী জানি! হয়তো নারী জাতি একটু বেশিই আবেগপ্রবণ। নারীরা "বন্ধন" নামক নকশীকাঁথায় একবার মায়ার গাঁথুনির সুঁই বিঁধলে,সে বুনন থেকে আর মুক্ত হতে পারে না!
তাদের যেই পিচ্চি বাচ্চাটা সে ঘুমোচ্ছে না। পিচ্চি বাচ্চাটার পাশে একটা কুকুরকে দেখলাম বসে থাকতে। পিচ্চিটা কুকুরটার দিকে হাত-পা ছুঁড়ে মারছে শূন্যে আর শব্দ করে হাসছে। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে বাচ্চাটা কুকুরটার সাথে কথা বলছে আর কুকুরটা চুপচাপ ওর দিকে তাকিয়ে শুনছে। অদ্ভুত না? এই ব্যাপারটা যদি আমাদের পরিবারের কোনো পিচ্চির সাথে ঘটতো,এতোক্ষণে মা-বাবার মধ্যে একটা সাংসারিক ঝগড়া লেগে যেতে কেয়ারলেস নিয়ে নয়তো দু'জনেই মোবাইল বের করে ভিডিও করতে শুরু করতো সন্তানের প্রতিভা! দেখতে দেখতে বাচ্চাটা কুকুরটার আরো কাছাকছি চলে গেল।
কি জানি! বাচ্চাটা হয়তো তার কমফোর্টজোন খুঁজে পেয়েছে এই কুকুরটার মাঝে! সারাটা দিন মায়ের কোলে থেকে এতো এতো মানুষের মুখ ব্যাঙ্গচানো আর গালাগাল শুনতে শুনতে হয়তো তার আর মানুষদের ভালো লাগে না। তাই, দিনশেষে ভরসা খুঁজে নিয়েছে এই কুকুরটার মধ্যে। কুকুরটা অন্তত তার কথা শুনে, তার মা-বাবাকে গালাগাল দেয় না। এক্ষেত্রে মানুষদের থেকে কুকুরটা অনেক ভালো!
হঠাৎ খেয়াল করলাম, পকেটে থাকা মোবাইলটার টোন বাজছে। ভাইয়া ইতিমধ্যে তিনবার কল দিয়েছে। ভাবনার মধ্যে এতোটাই মগ্ন ছিলাম যে, খেয়ালই ছিল না কখন ২০ মিনিট পেরিয়ে গেল। কল ব্যাক করার আগেই উনি আবার কল দিলো।
ভাইয়ার সাথে দেখা করে বাসায় ফিরছি। প্রায় আধাঘন্টার মতো উনার সাথে আড্ডা দিয়েছি। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত প্রায় ১০ টার কাছাকাছি বাজে। ভেবেছিলাম রিকশা নিয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে যাবো, গিয়ে আবার কোড নিয়ে বসতে হবে। কিন্তু উনার সাথে কথা বলার পর মাথা একদম ফাঁকা হয়ে আছে।
গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়া শুরু হয়েছে। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা গায়ে মেখে হাঁটছি আর ভাবছি ভবিষ্যত আর ক্যারিয়ারের এই প্যারাডক্স, এর কোনো সল্যুশন আছে কিনা! অনার্স লাইফে উঠে আমরা ভাবছি কোনো রকমে ইন্ডাস্ট্রিতে ঢোকবার মতো স্কিল ডেভেলপ করে জব পেয়ে গেলেই জীবনে মূল মোটো পাওয়া হয়ে যাবে। আবার ও-ই দিকে জব হোল্ডার ভাইয়া আপুদের জীবনের প্যারার বর্ণনা শুনে মনে হয় না, জীবনের মূল মোটো জব পাওয়া পর্যন্তই শেষ হওয়া উচিত।কেমন যেন একটা ইনফিনিটি লুপ এর মধ্যে পড়ে গিয়েছি মনে হচ্ছে!
23th August 2022
Tuesday,1:20 am

মন্তব্যসমূহ