এই শহরের ইয়ং জেনারেশন সবাই ড্রাগ এডিক্টেড না,সবাই ইভটিজার না, সবাই স্বার্থপর না, সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত না
রাজগঞ্জ যাচ্ছিলাম, কুমিল্লার কিছু ব্যস্ততম জায়গার মধ্যে একটি। বাজার, আউলেট,শোরুম, মার্কেট সবমিলিয়ে মানুষের হিজিবিজি একটা অবস্থা! আমি সাধারণত কোনো কাজ না থাকলে এই হিজিবিজি আর ব্যস্ততম জায়গাগুলো এড়িয়ে চলি! কাজ এর জন্য তাই অনেকদিন পর রাজগঞ্জ যাওয়া।
জ্যাম আর মানুষদের ভীড় ঠেলে সামনে আগাচ্ছি।মেজাজ এমনিতেই তিরিক্ষি হয়ে আছে,কোনো রকমে ব্রুঁ কুঁচকে তাড়াহুড়ো করে হাঁটছি।
মাইকের আওয়াজে সামনে চোখ পড়লো, এক মধ্যবয়স্ক আঙ্কেল সাথে ২৫-২৬ বছরের এক আপু(খুব সম্ভবত উনার মেয়ে)কে নিয়ে হ্যান্ড মাইক নিয়ে কথা বলছে। আপুটা খুব হাসি হাসি মুখ করে টাকা নিচ্ছে মানুষজন থেকে। অটোর পেছনে বড় বড় করে লিখা,"সিলেট সুনামগঞ্জ এর বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে....... "পুরোটা পড়তে পাড়িনি পেছন থেকে ধাক্কা এসে লাগল। বুঝলাম হাঁটার গতি স্লো হয়ে গিয়েছে আমার! দৃশ্যটা দেখে কিছুটা সময় আসলেই ভাবনার ঘোরে চলে গিয়েছিলাম। মধ্যবয়স্ক একটা মানুষ, যেই বয়সটায় উনার ঘরসংসার, দুনিয়াদারী, দুশ্চিন্তা হতাশা এসব নিয়ে তীব্র ব্যস্ত থাকার কথা এই সময়টা একটা মেয়েকে নিয়ে অসহায় মানুষদের জন্য ব্যয় করছে। এই সময়টায় হয়তো উনি উনার বিজনেসে দিলে আরো বেশি ডিজিটের ইনকাম করতে পারতো, স্টক মার্কেটে শেয়ারের ভ্যালু বাড়াতে পারতো কিংবা চাকুরিজীবী হলে ওভারটাইম করে বসের সাথে সাথে নিজের পকেটকেও খুশি করতে পারতো। কিন্তু না, কতো চমৎকার ভাষায় মানুষকে অনুপ্রাণিত করছেন সাহায্য করতে! অনেককে দেখলাম টাকা পয়সা দিচ্ছেও। কত সুন্দর একটা দৃশ্য, যেখানে সামনাসামনি থেকে দু'জন ভালো মনের মানুষকে বিনা স্বার্থে এগিয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে! একপক্ষ সময় ও শ্রম দিয়ে আরেক পক্ষ অর্থ ও হাঁসি দিয়ে।
ফিরার পথে রিকশা নিলাম,তীব্র জ্যাম। সব রিকশা আর অটো গুলো যেন তিন গজ এগিয়ে তিন মিনিটের ব্রেক নিচ্ছে এমন একটা অবস্থা। রিকশা নিউমার্কেট এরিয়ায় আসতে কয়েকজন ভলেন্টিয়ারকে দেখলাম হাতে বাক্স নিয়ে ছুটোছুটি করতে। কেউ কেউ নিউমার্কেটে দু,তিন তলায়, কেউ এলিভেটরে, কেউ জ্যামে পড়া যানগুলোর প্রতিটার দুয়ারে দুয়ারে এসে। সবার একটাই উদ্দেশ্য বন্যার্তদের পাশে দাঁড়াতে যে, যতটুকু পারি সাহায্য করতে। কেউ টাকা দিচ্ছে, কেউ ফিরিয়ে দিচ্ছে, কেউ কিছুই বলছে না তারপরও তারা দাঁড়িয়েই আছে যাত্রীর মনে হঠাৎ যদি মানবিকতা জেগে উঠে, এই আশায়! ভলেন্টিয়ারিং করা ভাই আপুদের অনেককেই দেখলাম বিএনসিসির ড্রেস পড়া,অনেকে এপ্রোনের মতো(হয়তো কলেজ ড্রেস) পোশাক পড়া। উনাদের স্পিরিট আর স্যাক্রিফাইস দেখে অবাক হচ্ছি! গত দুই বছরে কুমিল্লা শহরের সবথেকে সুন্দর দৃশ্যটা মনে হয় আজকে দেখেছি!
এই শহরের ইয়ং জেনারেশন সবাই ড্রাগ এডিক্টেড না,সবাই ইভটিজার না, সবাই স্বার্থপর না, সবাই নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত না। এই যে এই আঙ্কেল, ভাই-আপুদের মতো অনেকেই আছেন,যারা দুর্দিনে ফিনিক্স পাখির মতো উদয় হয়❤️। আমরা তাদের সচরাচর দেখি না, কারণ তারা মানিবক কাজ শেষ হলে আবার মানুষের ভীড়ে মিশে যায়!
শীতকালে শীতবস্ত্র বিতরণের জন্য, করোনার সময় খাবার এর জন্য, এক বন্ধুর অপারেশনের জন্য, এক আপুর বাবার চিকিৎসার জন্য মানুষের কাছে গিয়ে টাকা খোঁজার এই অভিজ্ঞতাগুলো আমারও হয়েছিলো। প্রতিটা অভিজ্ঞতার শেষে তখন আমরা এক বন্ধু আরেক বন্ধুকে বলতাম, " পৃথিবীর সবথেকে কঠিন কাজ মানুষের থেকে টাকা আদায় করা,তাও তাদের যেখানে কোনো স্বার্থ নেই"। তবে মজার বিষয় কী, এসব কাজে আপনি একদম সামনাসামনি থেকে মানুষের মানবিকতা পরিমাপ করতে পারবেন। যেখানে নিজের সময় আর শ্রমকে স্যাক্রিফাইস করছেন ভালো কাজে,সেখানে কে কি বললো আর মনে করলো তা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় নেই!
তবে সত্যি এই যে, প্রতিটা ইভেন্ট শেষে আমি ডাইরিতে খুব তৃপ্তি নিয়ে লিখতে বসতে পারতাম যে আমি কতোটা সুখী নিজেকে নিয়ে, একটা অন্যরকম ভালো-লাগা আর মানসিক শান্তি নিয়ে ঘুমোতে যেতে পারতাম ওইদিনগুলোয়।
আপনি যতো ভালো কাজ করবেন, মরণের ভয় ততো কমে যাবে আপনার।কারণ পুরস্কার আপনার জন্য অপেক্ষা করছে পরকালে!
মন্তব্যসমূহ