ভালোবাসা অদ্ভুত একটা সমীকরণ!
টিউশন থেকে ফিরছিলাম,মাঝরাস্তায় এসে হোঁচট খেয়ে স্লিপার গেলো ছিঁড়ে! এখন এই ছেঁড়া জুতা নিয়ে যাই কোথায়? কোনো রকমে বিরক্তি চাপা দিয়ে রিকশা ডাকলাম। গন্তব্য মুচি যেখানে বসে সেখানে।
মুচির সামনে রিকশা এসে থামলো। ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে রিকশাওয়ালা মামাকে বিদায় করলাম। মুচি মধ্যবয়স্ক হেঙ্গলাপাতলা একজন মানুষ,মার্কেটের সামনে বিস্তৃত ফুটপাতের একটুখানি জায়গা নিয়ে বসে আছে। টিউশনে আসা যাওয়ার সময় অনেক বার উনার সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করেছি,কিন্তু কখনো ভাবি নি,উনাকে একটা দিন এমনভাবে প্রয়োজন পড়বে!
"মামা এই স্যান্ডেলটা একটু সেলাই করে দেন"। উনি উনার বক্স থেকে বের করে এক্সট্রা একজোড়া স্যান্ডেল দিল পড়ে দাঁড়াতে। সৌজন্যবোধের হাসি দিয়ে ফুটপাতের পাশেই উনার সাথে বসে পড়লাম। উনি কিছুটা অবাক হলেন মনে হলো। আমি উনার দিকে তাকিয়ে হাসি হাসি মুখ করে জিজ্ঞেস করলাম,
-" কি খবর মামা, কাস্টমার কেমন আসলো আজকে?"
-"আর কাস্টমার মামা(হেঁসে)। আপনারা সবাই এখন দামী দামী জুতা পড়েন, ছিঁড়েও না, সিলাইতেও আয়েন না।সবাই জুতা একবার ছিঁড়লেই একদম ফালায় দেয় মামা। এই যে যারাই আঁয়ে,আপনার মতো মাঝ রাস্তায় জুঁতা ছিঁড়লে আঁয়ে।"
- "তা ঠিক বলছেন মামা। এই টাকায় সংসার চালানো তোহ অনেক কঠিন। আজকে কেমন আয় হইলো?
পকেট থেকে ভাঙ্গতি কিছু টাকা বের করে হাসি দিয়ে বললেন,
-"এই হইলো ইনকাম আজকার"(হাসি)
সম্ভবত ওখানে ২০০-২৫০ টাকা হবে আনুমানিক।
- "তোহ মামা সংসার চলে এই টাকায়।"
-"আল্লাহ চলায় আরকী।"(হাসি)
ততোক্ষণে আমার জুতা সেলাই করা শেষ। ভালো লাগতেছিলো ফুটপাতে বসে থেকে মানুষের পায়ের দিকে তাকিয়ে তাদের ছুটে চলা দেখতে।
আমি স্বভাবতই বাচ্চাকাচ্চা আছে কিনা, পড়াশোনা করে কিনা এসব সিরিয়াস টপিক নিয়ে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি না এসব ক্ষেত্রে। তাই মজা করেই হেঁসে জিজ্ঞেস করলাম,
-" তাইলে মামা, মামী শাড়ী-চুড়ির আবদার করে না? আমি তো মামা এসব আবদার রাখতে হবে ভয়ে প্রেম টেমই করতে পারি না। আজকাল শাড়ি চুড়ি আর রিকশা দিয়ে ঘুরার যা দাম!"
মামা বুঝতে পারতেছে আমি উনার সাথে মজা করতেছি। উনিও হেঁসে আমাকে যেই উত্তর দিলো তার জন্যে আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না!
- "মামা, আপনার মামীর সাথে পরিচয় বিয়ার অনেক আগে থেকেই।ক্লাস টেনে থাকতে আমরা ভাইগা যাই, পরীক্ষা আর দেয় নাই।পড়ালেখা ওইখানেই শেষ। আপনাগো বয়সে থাকতে অনেক ঘুরছি, অনেক শখ আবদার পূরণ করছি ওর।এখন দেখা যাই তৌফিকেও কুলায় না, আবার আপনার মামীও এখন আর এতো শখটখ রাখে না আমার কাছে। হয়তো আপনার মামী আমার সামর্থ্য বুঝে এখন,সে ভাত-কাপড়েই আমারে ভালোবাসে এখনও। একবার হুট করে শাড়ি কিন্না দেওয়ার আবদার কইরা বসছিলো। আমি তখন আপনার মামীর আবদার রাখতে নিজের শখের মোবাইলটা বেইচ্চা দিছিলাম।আপনার মামী এটা অনেকদিন পর জানতে পারছে, এর পর এমন চেতাচেতছিলো আমার উপরে যে আর কোনো আবদারই করে না(হাঁসি)"
-"বাহ,আপনাদের তো দেখি একদম লাভ স্টোরি।আপনাদের গল্প দিয়ে একটা বাংলা ছবি হইতে পারতো।ভিলেন-টিলেন ছাড়া একদম রোমান্টিক একটা গল্প। মামা আজকে ওঠি তাইলে,এই নেন টাকাটা"
কথাগুলো আমি অনেকটা নরমাল হয়ে বলছিলাম।ভেতরে ভেতরে উনার কথায় প্রচন্ড শক খেয়েছিলাম, তা উনাকে বুঝতে দেয় নি।আমি কখনো আশাও করি নি ফুটপাতের পাশে যে মানুষটা দৈনিক ১২-১৪ ঘন্টা বসে জীবিকা নির্বাহ করে তারও এতো অসাধারণ গল্প থাকতে পারে জীবনে।
ভালোবাসা অদ্ভুত একটা সমীকরণ! যে সমীকরণ সমাধান সেলিব্রেটি,সৌন্দর্য্য, শিক্ষা আর টাকা দিয়ে হয় না। যার সমাধান পৃথিবীর খুব কম মানুষই করতে পারে।তাদের মধ্যে হয়তো এই মামাও একজন!
মন্তব্যসমূহ