আব্বা আমার কাছে লুকায় তার একা থাকার যন্ত্রণা আর আমি লুকায় আমার অনুশোচনাবোধ!

ছোটবেলায় এমন একটা সময় ছিল যখন একটা রুমে দুই ভাই এক বোন থাকতাম,পাশের রুমে আব্বা-আম্মা

প্রাইভেসি,বেডরুম এসব শব্দের সাথে তখনও খুব পরিচিত ছিলাম না। আস্তে আস্তে বড় হতে থাকি এভাবেই। 

যতোই বাইরের পরিবেশের সাথে পরিচিত হতে থাকি, ততোই নিজের একটা বেডরুম,পরিপাটি একটা পড়ার টেবিলের ইচ্ছে জাগতে শুরু করে!কিন্তু তা আর সম্ভব হয়ে উঠে নি! তখন খুব রাগ হতো বাবা-মা এর উপর,নিজের ভাইবোনের উপর, এই ছোট্ট ঘরটার উপর!ছোট্ট ওই ঘরটাকে এতো অভিশাপ দিয়েছি যে, ঝড় আসলে মনে হতো এই বুঝি ভেঙে পড়বে। 

এভাবে আমি অনেকটাই বড় হয়ে গিয়েছিলাম।যেদিন পড়াশোনার স্বার্থে বাসার বাইরে চলে গিয়েছিলাম, সেদিন যেন আমার সবথেকে সুখের দিন ছিল।একদম এই গিঞ্জি ঘর থেকে হাফ ছেড়ে বাঁচা যাকে বলে! 

তবে উপরওয়ালা ঠিকই একদিন অভিশাপ কবুল করে নিলো! যেইদিন ওই ছোট্ট ঘর ছেড়ে নতুন ঘরে পা রাখলাম কেমন যেন একটা তীব্র যান্তিক স্বার্থপরতা কাজ করছিলো মনে! গত ১০ বছরের স্মৃতি যেই ঘরে, সেই ঘরে আর থাকা হবে না! কত ঝড় বৃষ্টি আর তপ্ত দুপুর কাটানো একটা স্বয়ং সম্পূর্ণ পরিবারের আর থাকা হবে না ওই ঘরে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল এসব ভেবে!

নতুন ঘরে উঠলাম ঠিকই, তবে অসম্পূর্ণ একটা পরিবার! বোনের বিয়ে হয়ে গেল, ভাই এর অনুপস্থিতি,মাকে হারলাম!

সপ্তাহে একটা দিন বাসায় আসি। সারাদিন শেষে, রাতে যখন বাসায় এসে গেইটের তালা খুলে নতুন এই অন্ধকার বিল্ডিংয়ে পা রাখি তখন এক বিষাদগ্রস্ততা আমাকে ছেঁয়ে যাই।ঘরটায় ঢুকেই আমি অন্ধকার হাতরিয়ে বাতিটা জ্বালায় না। কতক্ষণ একা বসে থেকে অতীতের অভিশাপের প্রায়শ্চিত্ত করি এক নিনাদ বিষাদে! মাঝে মাঝে মনে হয় এসব তো আমারই তীব্র ঘোরের ফল!

আব্বা আসে,দুজনে মিলে খাবার গরম করে খেতে বসি। দুজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়ি দেশ আর দশের কথায়।পাশের ফাঁকা রুমগুলি প্রতিধ্বনি তুলে আমাদের অপূর্ণতায়।অথচ আব্বা আমার কাছে লুকায় তার একা থাকার যন্ত্রণা আর আমি লুকায় আমার অনুশোচনাবোধ! আমি তো সপ্তাহে একটা দিন বাসায় কাঁটায় তাতেই এই একাকীত্বের ভোগান্তি, আব্বার তো প্রতিটা সপ্তাহ কাটাতে হয় এভাবেই!

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

আপনার ব্যক্তিগত জীবন অনলাইনে বেচা-কেনা হচ্ছে

Dear GEN-Z

QuotaReformProtest