মায়া( হিমু সিরিজ -০৪)
আজকাল অদ্ভুত একটা শখ পেয়ে বসেছে মনে! রূপার দেওয়া ডাইরিটা পাওয়ার পর থেকে ডাইরিটা যেন নিজ থেকে আমাকে ডাকছে। আর্টিফিশিয়াল লেদারের ডাইরিটা যে-কেউ দেখলেই রূপার পছন্দের প্রশংসা না করে পারবে না একথা আমি হলফ করে বলতে পারি। কিন্তু আমি তো হিমু, আর হিমুরা কখনো আবেগ প্রকাশ করে না তাই উপহারটা নিতান্তই নেওয়ার জন্য নিয়েছি এমন অভিনয় করে ডাইরিটা গ্রহণ করেছিলাম। এখন দেখছি ডাইরি লিখার আগ্রহটা ক্রমশই গাঢ় হচ্ছে। রপা অবশ্য ডাইরিটা দিয়ে বলেছিল, " তুৃমি তো আমার কথা কখনও ভাবো না, আমার কথা মনেও করো না, আমি তোমার আর পূর্ণিমার মাঝে ফিলোসোফিটা বুঝতে চাই। তাই তুমি এখন থেকে ডাইরি লিখবে আমি তোমার অনূভুতি আর চিন্তাভাবনার জগৎ জানতে চাই। " রূপা যখন তার আহ্লাদ নিয়ে রাগী রাগী ভাব নেওয়ার চেষ্টা করে তখন মনে হয় আমার সামনে এ যেন আমার দেখা সবথেকে সুন্দরী মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে। একদিন হয়তো বলেই বসবো," রূপা এভাবে আরো কিছুক্ষণ আমার সামনে বসে থেকো, তোমাকে এই গাম্ভীর্য্যেই অনেক মানায়! " ওর দেওয়া ডাইরিটা আর টেবিলের উপর ক্যাপহীন কলমটা তুলে নিলাম। এমনি সময় কারেন্টটা চলে গেল! খোলা জানালা দিয়ে পূর্ণিমার উজ্জ্বল আলো যেন চৌকির উপরটাকে রহস্যময়ী করে তুললো! এই মৌনতার মাঝে উঠে গিয়ে মোমবাতি জ্বালানোর সাহস করলাম না, তাহলে উজ্জ্বল জ্যোৎস্নাটাকে অপমান করা হবে! ডাইরিটা খুলে প্রথম পৃষ্ঠাটায় লিখলাম
" প্রিয় রূপা,
আজকের পূর্ণিমার চাঁদটাকে দেখেছো? কী এক রহস্যময়ী আঁভায় ভাসিয়ে দিয়েছে চারপাশটাকে! এমনই এক পূর্ণিমায় তুমি নীল শাড়ি পড়ে চোখে গাঢ় কাজল দিয়ে বারান্দায় এসে দাড়িও,আমি আমার দেখা সবথেকে সুন্দরী মেয়েটিকে নিয়ে পূর্ণিমা বিলাসে যেতে চাই!
ইতি
হিমু "
পরক্ষনে ডাইরির পৃষ্ঠাটা ছিঁড়ে চার টুকরো করে জানালার ফাঁক গলে সেই পূর্ণিমার আলোয় ছুড়ে দিলাম। আমি জানি রূপা নিশ্চয়ই জিজ্ঞেস করবে, "এই পৃষ্ঠাটা ছিঁড়া কেন?" আমি বলবো," মিল ম্যানেজার রমিজ সাহেব রুমে এসেছিল, বাজার সদায় এর লিস্ট করতে ডাইরির এই পৃষ্ঠাটা দিয়েছিলাম । "
আমি জানি, রূপা ঠিকই বুঝে যাবে এই পৃষ্ঠাটায় ওকে নিয়ে কিছু লিখেছিলাম, এই একটা ক্ষেত্রে মেয়েদের সিক্সথ সেন্স খুবই প্রবল! প্রিয় মানুষদের এরা যুক্তি দিয়ে নয় বরং আবেগ দিয়ে যাচাই করে যেখানে আমরা পুরুষরা সবক্ষেত্রে যুক্তি খুঁজি।
আমি জানি, রপা প্রতি পূর্ণিমার রাতে নীল শাড়ি আর চোখে কাজল দিয়ে বারান্দায় এসে ঠিকই এই হলুদ পাঞ্জাবি পড়া ভ্যাগাবন্ডাটার জন্য অপেক্ষা করে। অপেক্ষা করতে করতে যখন পূর্ণিমার চাঁদটা মাঝরাত পেরিয়ে নেমে যাই তখন ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে রুপা আরেকটি অপেক্ষার প্রহর শেষ করে রুমে ফিরে যাই।
অন্যসব প্রেমিকের মতো আমারও এরজন্য অনুতপ্ত হওয়ার কথা, কষ্ট পেয়ে তার পাশে ছুটে যাওয়ার কথা কিন্তু না ! আমি তো হিমু, আর হিমুরা জগতের মায়া-ভালোবাসা আর সকল টানের উর্ধ্বে তাই চাইলেই তারা রূপাদের কাছে ভালোবাসা নিবেদন করতে পারে না, চাইলেই বলতে পারে না, " রূপা তুমি আমার দেখা সবথেকে মায়াবিনী রূপসী নারী! "!!!
মন্তব্যসমূহ